Thursday, July 25, 2013
" নামাযে আমীন বলা ", by শায়েখ গোলামুর রাহমান
হানাফী মাযহাবের সাথে ইমাম বুখারীর সম্পর্ক
হানাফী মাযহাবের সাথে ইমাম বুখারীর সম্পর্ক
- তারেক
এই পোস্টে আমরা ইমাম বুখারীর সাথে হানাফী মাযহাবের সম্পর্ক কেমন, তা একটু দেখব ইনশাল্লাহ।
১।ইমাম বুখারীর নাম হল-মুহাম্মদ বিন ইসমাইল রহঃ। ইমাম বুখারীর পিতার নাম হল
ইসমাইল। সিয়ারু আলামিন নুবালা নামক রিজালশাস্ত্রের গ্রন্থে ইমাম বুখারী
রহঃ এর বরাতে বর্ণনা করা হয়েছে-
إسحاق بن أحمد بن خلف، أنه سمع البخاري يقول: سمع أبي من مالك بن أنس، ورأى
حماد بن زيد، وصافح ابن المبارك بكلتا يديه (سير اعلام النبلاء، الطبقة
الرابعة عشر، أبو عبد الله البخاري، رقم -171)
অনুবাদ-ইসহাক বিন আহমাদ খালফ বলেন-আমি ইমাম বুখারী রহঃ কে বলতে শুনেছি যে,
তিনি বলেছেন-আমার পিতা মালেক বিন আনাস থেকে শুনেছেন, আর তিনি হাম্মাদ বিন
জায়েদকে দেখেছেন, আর তিনি ইবনুল মুবারকের সাথে দুই হাতে মুসাফাহা করেছেন।
{সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৪ তম তবক্বা, নং-১৭১, রাবী ইমাম বুখারী}
ইমাম বুখারীর পিতা ইবনুল মুবারক রহঃ এর সাথে দুই হাতে মুসাফাহা করেছেন। হানাফী মাযহাবেও দুই হাতে মুসাফাহা করার কথা বলা হয়েছে।
২।
ইমাম বুখারী সর্বপ্রথম উস্তাদ কে? পাঁচ বছর বয়সে তার পিতা তাকে কুরআন পড়ান।
ক) তারপর সর্বপ্রথম মক্কী বিন ইবরাহীম রহঃ এর কিতাব পড়েন।
খ) ইমাম আব্দুল্লাহ বিন মুবারকের কিতাব পড়েন।
গ) ইমাম সুফিয়ান সাওরীর আল জামেউল কুবরা পড়েন।
ঘ) আবু হাফস রহঃ এ কিতাব পড়েন।
এখানে লক্ষ্য করুন মক্বী বিন ইবরাহীম ইমাম আবু হানীফা রহঃ এ ছাত্র।
আব্দুল্লাহ বিন মুবারক রহঃ ও ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্র ।
ইমাম সুফিয়ান সাওরীও হানাফী।
ইমাম আবু হাফস রহঃ হানাফী।
তাহলে ইমাম বুখারী রহঃ এর পড়াশোনা শুরু হানাফী মাযহাবের সাথে সংশ্লিষ্ট
ব্যক্তিদের কিতাব পড়ার মাধ্যমে। যার কাছে পড়েছেন তিনিও ইমাম আবু হানীফা
রহঃ এর ছাত্র।
৩।
ক) ইমাম বুখারী রহঃ এর বয়স যখন ১৫/১৬ বছর হয় তখন আরো পড়াশোনা করার জন্য
২১০ হিজরীতে নিজের পিতার ও তার ভাই আহমাদের সাথে মক্কায় গিয়ে হজ্ব করেন।
তারপর সেখানে হাদীস পড়েন, তাদের মাঝে সবচেয়ে বড় উস্তাদ হল আবু আব্দুর
রহমান আল মুকরীর কাছে। যিনি হলেন ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্র।
খ) ইমাম বুখারী যখন বসরায় গেলেন। তখন সেখানে যাদের কাছে হাদীস পড়েন,
তাদের মাঝে বড় উস্তাদ হলেন ইমাম আবু আসেম রহঃ, যিনি ইমাম আবু হানীফা রহঃ
এর ছাত্র।
তারপর আরো একজন বড় উস্তাদ হলেন-মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আল আনসারী রহঃ। তিনিও আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্র।
গ) তারপর কুফা গেলেন সেখানে যাদের কাছে কিতাব পড়লেন, তাদের মাঝে বড়
উস্তাদ হলেন উবায়দুল্লাহ বিন মুসা। তিনিও ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্র।
আরেক উস্তাদের নাম আবুল ফুজাইল রহঃ তিনিও ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্র।
ঘ) তারপর পড়ার জন্য বাগদাদ গেলেন, সেখানে যাদের কাছে পড়েছেন। তাদের মাঝে
বড় উস্তাদের নাম হল ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহঃ। যিনি ইমাম আবু ইউসুফ রহঃ
এর ছাত্র। আর ইমাম আবু ইউসুফ রহঃ ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর খাস ছাত্র।
লক্ষ্য করুন ইমাম বুখারী রহঃ নিজের শহরে পড়াশোনা করেছেন তো ইমাম আবু
হানীফা রহঃ এর ছাত্রদের কাছে পড়েছেন। অন্য শহরে গিয়ে পড়াশোনো করেছেন
ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্রদের কাছেই পড়েছেন।
কুফা নগরীর সাথে ইমাম বুখারীর সম্পর্কঃ
ইমাম বুখারী (রহঃ) যেসব শহরে গিয়েছেন তার মাঝে কুফা নগরীতে তিনি সবচেয়ে
বেশি গিয়েছেন। সেখান থেকে সবচেয়ে বেশি ইলম অর্জন করেছেন। এজন্য বুখারীর
পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় কুফী রাবী বিদ্যমান।
অথচ কুফার বিরুদ্ধাচারনকারীরা কার বিরুদ্ধাচরণ করছে নিজেরা বুঝতেও পারে না।
কুফাকে আবাদকারী হলেন হযরত সাদ বিন আবী ওয়াক্বাস।
আবাদের নির্দেশকারী হযরত ওমর রাঃ।
আবাদ করার জন্য প্রথম আমীর হিসেবে কুফায় আসেন তিনি হলেন আম্মার বিন ইয়াসির রাঃ।
সেখানের প্রথম শিক্ষক হলেন আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ।
যারা প্রথমে আবাদ করেছেন ১০৫০ সাহাবীদের মাঝে ৭০ জনই বদরী সাহাবী। আর ৩১৩ জন রাসূল সাঃ এর সাথে হজ্বকারী সাহাবী।
তাহলে কুফা আবাদ করার হুকুম দিলেন খলীফায়ে রাশেদ রাসূল সাঃ এর প্রিয় সাহাবী হযরত ওমর বিন খাত্তাব রাঃ।
কুফা আবাদকারী হলেন নবীজী সাঃ এর সাহাবী সাদ বিন আবী ওয়াক্কাস রাঃ।
প্রথম আমীর আম্মার বিন ইয়াসীর রাঃ।
প্রথম শিক্ষক আব্দুল্লা্হ বিন মাসউদ রাঃ।
আবাদকারী সাহাবীদের মাঝে ৭০ জন বদরী সাহাবী। আর ৩১৩ জন রাসূল সাঃ এর সাথে হুদায়বিয়ার সন্ধিতে অংশগ্রহণকারী সাহাবী।
সুতরাং কুফার বদনাম করলে মূলত কার বদনাম করা হয়? বদনামতো প্রতিষ্ঠানের হয়
না, হয় প্রতিষ্ঠাতার। তাহলে কুফার বদনাম করা মানে হল কুফা প্রতিষ্ঠাতার
উপর বদনাম করা।
কথিত আহলে হাদীসরা একটি খোড়া যুক্তি দাঁড় করিয়ে থাকে যে, কুফাতে হযরত হুসাইন রাঃ শহীদ হয়েছেন তাই এটি অভিশপ্ত ভূমি।
কোন এলাকায় আল্লাহর কোন প্রিয় বান্দা শহীদ হলে বা কষ্ট পেলে সে স্থান যদি
অভিশপ্ত হয়, তাহলে মক্কাও অভিশপ্ত হয়ে যাবে, নাউজুবিল্লাহ। কারণ মক্কায়
রাসূল সাঃ কে অনেক কষ্ট দেয়া হয়েছে।
ওহুদে ৭০ জন সাহাবী শহীদ হয়েছেন।
রাসূল সাঃ এর মিম্বরে হযরত ওমর রাঃ শহীদ হয়েছেন।
মদীনার মিম্বরে হযরত উসমান রাঃ শহীদ হয়েছেন।
তায়েফে রসূল (সঃ) এর উপর আক্রমণ হয়েছে।
তাই এখন বলুন, মক্কা-মদীনা, উহুদ, তায়েফের বদনাম করাটা কতটা বুদ্ধিমানের কাজ? না চূড়ান্ত পর্যায়ের বোকামী?
তেমনি হযরত হুসাইন রাঃ শহীদ হওয়ার কারণে কুফাকে বদনাম করা যাবে না। যারা
শহীদ করেছেন তাদের বদনাম হতে পারে, কিন্তু যেখানে শহীদ হয়েছেন সে স্থানের
বদনাম করাটা চূড়ান্ত পর্যায়ের আহমকীর নিদর্শন।
এবার দেখুন কুফার সাথে ইমাম বুখারীর কতটা সম্পর্ক?
ইমাম বুখারী রহঃ নিজেই বলেন-
قال البخاري دخلت إلى الشام ومصر والجزيرة مرتين وإلى البصرة أربع مرات
وأقمت بالحجاز ستة أعوام ولا أحصي كم دخلت إلى الكوفة وبغداد مع المحدثين
(مقدمة فتح البارى، كتاب البيوع الى السلم، ذكر عدة ما لكل صحابي في صحيح
البخاري موصولا ومعلقا على ترتيب حروف المعجم-1/147)
আমি সিরিয়াতে এবং মিশরে ও জাজিরাতুল আরবে গিয়েছি ৪ বার। আর হেজাযে
অবস্থান করেছি ৬ বছর। আর কতবার যে কুফা আর বাগদাদে মুহাদ্দিসদের সাথে
গিয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই।
{মুকাদ্দিমায়ে ফাতহুল বারী)
ইমাম বুখারী হেজাযে কতদিন ছিলেন মনে আছে, মিশর, সিরিয়া ও জাজিরাতুল আরবে
কতবার গেছেন মনে আছে। কিন্তু কুফা আর বাগদাদের কত অগণীত বার গেছেন তা
আধিক্যের কারণে তিনি ভুলেই গেছেন।
একথা সুষ্পষ্ট প্রমাণ করে ইমাম বুখারী রহঃ এর কুফার সাথে তার ইলমী নিসবত
কতটা গভীর ছিল। একারণেই বুখারী শরীফের এমন পৃষ্ঠা খুব কমই আছে যাতে কুফী
বর্ণনাকারী নেই। পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় কুফী রাবী। এটাও সুষ্পষ্ট প্রমাণ ইমাম
বুখারী কুফার প্রতি কতটা কৃতজ্ঞ।
সুতরাং বুঝা গেল কুফার ভক্ত ছিলেন ইমাম বুখারী। বিদ্বেষী নয়। তাই ইমাম বুখারী হানাফী মাযহাবের প্রাণকেন্দ্রের ভক্ত ও ঋণী।
ইমাম যাদের কাছে পড়েছেন তাদের সম্পর্ক হানাফীদের সাথে। যেসব শহরে গিয়েছেন তাদের সাথেও হানাফীদের সম্পর্ক।
৪।
ইমাম বুখারী রহঃ পড়াশোনা শেষ করে যখন লেখালেখি ও পড়ানো শুরু করেন, তখন
তিনি যত কিতাব লিখেছেন তার মাঝে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ কিতাবের নাম হল বুখারী
শরীফ। বুখারী শরীফের দিকে আমরা একটু নজর দেই।
বুখারীতে শাওয়াহেদ, মুরসালসহ সর্বমোট ৯০০৮২ বর্ণনা আছে। সনদের মাঝে বুখারী
রহঃ যার কাছ থেকে হাদীস নিয়েছেন তিনি হলেন ইমাম বুখারী রহঃ এর শায়েখ। আর
সনদের সর্বশেষে যিনি হন তিনি হন সাহাবী রাঃ।
বুখারীতে এমন বর্ণনা অনেক আছে যাতে ইমাম বুখারীর শায়েখ ও কুফী এবং হাদীস
বর্ণনাকারী সাহাবীও কুফাতে অবস্থানকারী। শুধু তাই নয়, এমন বর্ণনাও আছে যার
প্রতিটি বর্ণনাকারী কুফী। যেমন-
392 – حدثنا عثمان قال حدثنا جرير عن منصور عن إبراهيم عن علقمة قال قال
عبد الله : صلى النبي صلى الله عليه و سلم – قال إبراهيم لا أدري – زاد أو
نقص الخ (صحيح البخارى، كتاب الصلاة، باب التوجه نحو القبلة حيث كان، رقم
الحديث-392)
বুখারীর এ বর্ণনাটিতে লক্ষ্য করুন-
ইমাম বুখারীর শায়েখ উসমান,
তার শায়েখ জারীর,
তার শায়েখ মানসুর,
তার শায়েখ ইবরাহীম নাখয়ী,
তার শায়েখ আলকামা,
তার শায়েখ আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ।
এ হাদীসের সনদের ৬ জন রাবী আছে। আর ৬ জনই কুফী রাবী।
শুধু কি তাই? বুখারী শরীফের সর্বশেষ হাদীসের সনদের দিকে লক্ষ্য করুন-
7124 – حدثنا أحمد بن إشكاب حدثنا محمد بن فضيل عن عمارة بن القعقاع عن أبي
زرعة عن أبي هريرة رضي الله عنه قال : قال النبي صلى الله عليه و سلم (
كلمتان حبيبتان إلى الرحمن خفيفتان على اللسان ثقيلتان في الميزان سبحان
الله وبحمده سبحان الله العظيم )
এ হাদীসের সনদের শুধুমাত্র হযরত আবু হুরায়রা রাঃ ছাড়া বাকি সকল রাবী কুফী।
আহমাদ বিন ইশকাব,
মুহাম্মদ বিন ফুযাইল,
আমারা বিন কা’কা’ ,
আবু জুরআ সবাই কুফী।
সুতরাং বুঝা গেল যে, ইমাম যাদের কাছে পড়েছেন তারাও কুফী। যাদের সনদের
হাদীস এনেছেন তারাও কুফী। ইমাম বুখারী রহঃ এর সাথে কুফার সম্পর্ক নিবিড়।
৫।
ইমাম বুখারী রহঃ বুখারীতে যেসব হাদীস এনেছেন সনদ সহকারে, তাতে ৫ সনদও আছে। ৪
সনদও আছে। ৩ সনদও আছে। ইমাম বুখারী রহঃ এর সবচেয়ে গর্ব হল ৩ সনদের উপর।
সনদ কম হলে হাদীসের মাঝে শক্তিমত্বা বেশি হওয়ায় ইমাম বুখারী সুলাসিয়াত
তথা ৩ সনদওয়ালা হাদীসের উপর গর্ব আছে। এবার দেখুন সেসব সুলাসিয়্যাতের কি
হাল?
বুখারীতে মোট সুলাসিয়্যাত হল ২২ টি।
এ ২২টি সুলাসিয়্যাতের ১১টি সনদে ইমাম বুখারী রহঃ এর শায়েখ হলেন-মক্বী বিন ইবরাহীম। যিনি ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্র।
এর মাঝে ৬ টি হাদীদের বর্ণনাকারী রাবী হলেন-আবু আসেম আন নাবীল রহঃ। তিনিও ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্র।
এর মাঝে ৩ তিনটি হাদীসের বর্ণনাকারী রাবী মুহাম্মদুল্লাহ আব্দুল্লাহ বিন আনসারী। যিনি ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্র।
এর মাঝে একটি হাদীসের বর্ণনাকারী রাবী হযরত হাম্মাদ বিন ইয়াহইয়া রহঃ। তিনি কুফী তথা কুফায় অবস্থানকারী ব্যক্তি।
এর মাঝে একজন রাবী হলেন ইসাম বিন খালেদ আল হিমসী। যিনি হেমসের অধিবাসী।
এবার লক্ষ্য করুন-ইমাম বুখারী রহঃ যে সুলাসিয়্যাতের উপর গর্ব, সেই ২২ টি
সুলাসিয়্যাতের ২০টির বর্ণনাকারী ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্রের। আর একটি
ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর নিজের এলাকা কুফার। আর একজন শুধুমাত্র হেমসের
অধিবাসী। তাহলে ইমাম বুখারী গর্ব করতে চান তো ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্র
ছাড়া করতেই পারেন না।
৬।
ইমাম আবু হানীফা রহঃ মদীনার ইলম পর্যন্ত আমাদের পৌছিয়েছেন সনদসহ। ইমাম বুখারী রহঃ ও মদীনার ইলম পর্যন্ত পৌঁছিয়েছেন সনদসহ।
লক্ষ্য করুন ইমাম বুখারী রহঃ এর মদীনায় নিয়ে যাওয়ার সনদ-
حدثنا أحمد بن إشكاب حدثنا محمد بن فضيل عن عمارة بن القعقاع عن أبي زرعة
عن أبي هريرة رضي الله عنه قال : قال النبي صلى الله عليه و سلم
ইমাম বুখারী রহঃ রাসূল সাঃ পর্যন্ত সনদ পৌঁছাতে মাধ্যম নিলেন ৫টি।
আহমদ বিন ইশকাব,
তারপর মুহাম্মদ বিন ফুযাইল,
তারপর আম্মারাহ বিন কা’কা’
তারপর আবু জুরআ,
তারপর আবু হুরায়রা রাঃ।
তাহলে ইমাম বুখারী রহঃ আমাদের মদীনায় পৌঁছাতে মাধ্যম বানালেন ৫টি।
এবার লক্ষ্য করুন ইমাম আবু হানীফা রহঃ আমাদের মদীনায় পৌঁছাতে কয়টি মাধ্যম ব্যবহার করেন-
عن ابى حنيفة عن عبد الله بن انيس قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم
عن ابى حنيفة عن عبد الله بن ابى اوفى قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم
عن ابى حنيفة عن عبد الله بن حارث قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم
عن ابى حنيفة عن جابر بن عبد الله قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم
ইমাম বুখারী যেখানে আমাদের মদীনায় পৌছাতে ব্যবহার করেন ৫টি মাধ্যম। আর ইমাম আবু হানীফা রহঃ ব্যবহার করেন মাত্র একটি মাধ্যম।
তিনি বর্ণনা করেন সরাসরি
হযরত আব্দুল্লাহ বিন উনাইস রাঃ থেকে।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন আবী আওফা রাঃ থেকে।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন হারেস রাঃ থেকে।
হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ রাঃ থেকে।
যেহেতু আমরা মদীনার ইলমে পৌঁছতে চাই। আর সেখানে পৌছতে ইমাম বুখারীর মাধ্যম
বেশি আর ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর মাধ্যম কম। তাই আমরা আবু বুখারী রহঃ কে
রেখে ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর তাক্বলীদ করে দ্রুত মদীনার ইলমের শহরে পৌঁছে
যাই।
৭।
ইমাম বুখারী রহঃ থেকে তার কিতাব ৯০ হাজার ছাত্ররা পড়েছেন। কিন্তু বুখারী শরীফের সনদ প্রসিদ্ধ চারজনের মাধ্যমে। যথা-
১-ইবরাহীম বিন মা’কাল বিন হাজ্জাজ আন নাসাফী রহঃ। তিনি ২৯৪ হিজরীতে ইন্তেকাল করেছেন।
২- হাম্মাদ বিন শাকের আন নাসাফী রহঃ। যিনি ৩১১ হিজরীতে ইন্তেকাল করেছেন।
৩-মুহাম্মদ বিন ইউসুফ আল ফিরাবরী রহঃ। তিনি ৩২০ হিজরীতে ইন্তেকাল করেছেন।
৪-আবু তালহা মানসুর বিন মুহাম্মদ রহঃ। তিনি ২৬৯ হিজরীতে ইন্তেকাল করেছেন।
লক্ষ্য করুন-৯০ হাজার ছাত্রদের মাঝে যে চারজনের সনদ প্রসিদ্ধ বুখারীর।
এর মাঝে প্রথম দুইজন তথা ইবরাহীম বিন মা’কাল বিন হাজ্জাজ আন নাসাফী রহঃ এবং
হাম্মাদ বিন শাকের আন নাসাফী রহঃ ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর মুকাল্লিদ।
তাহলে কি বুঝা গেল? ইমাম বুখারী রহঃ যাদের কাছে পড়েছেন তারাও হানাফী। যে
শহরে বেশি গেছেন সেটাও হানাফী। যাদের মাধ্যমে বুখারী প্রচারিত হয়েছে তারাও
হানাফী।
Source: http://www.somewhereinblog.net
Labels:
হানাফি মাযহাব,
হানাফি মাযহাব ও ইমাম বুখারী
ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আড়ালে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টির অপপ্রয়াস চলছে
ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আড়ালে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টির অপপ্রয়াস চলছে
-মাওলানা মুহাম্মদ রূহুল আমীন খান
ইসলামী উম্মাহ্ এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ইসলামের দুশমন সাম্রাজ্যবাদীরা মুসলিম জাহানব্যাপী চালিয়ে যাচ্ছে প্রলয় তান্ডব। কামানের গোলায়, বোমার বিস্ফোরণে, অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে বহু যত্নে গড়ে তোলা স্থাপনা, নগর, বন্দর, শহর ও জনপদ। জ্বলে পুড়ে ছারখার হচ্ছে শিল্প-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান। বইছে রক্ত-বন্যা। নিহত হচ্ছে সম্ভাবনাময় হাজারো তরুণ। স্বজনহারাদের আহাজারি ও মাতমে ভারী হয়ে গেছে আকাশ-বাতাস। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ উন্নতি ও সমৃদ্ধির পানে দ্রুত ধাবমান অঞ্চলগুলো ধ্বংসসূতপে পরিণত হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের আধিপত্য অক্ষুণ্ণ রাখতে, লুণ্ঠন অব্যাহত রাখতে অবলম্বন করে চলছে নিত্য নতুন কৌশল। চালিয়ে যাচ্ছে ষড়যন্ত্রের পর ষড়যন্ত্র। তারা ‘সর্প হয়ে দংশন করছে আবার ওঝা হয়ে আসছে ঝাড়ছে’। তারা গাছেরটা যেমনে খাচ্ছে তলারটাও তেমনি কুড়োচ্ছে। তাদেরই আগ্রাসী হামলায়, ইবলিসী ষড়যন্ত্রে ইরাক আজ ধ্বংস্তূপে পরিণত। আফগানিস্তান পোড়ামাটির দেশ। জ্বলছে ফিলিস্তিন। পাকিস্তান রক্তাক্ত। পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকার দেশে দেশে বীভৎস ধ্বংসলীলা। কূট কৌশলে তারা সক্ষম হয়েছে মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করতে, পরস্পরে দুশমনী সৃষ্টি করতে, এক গ্রুপকে আরেক গ্রুপের বিরুদ্ধে সংঘাত, সংঘর্ষ ও লড়াইয়ে লিপ্ত করতে। এটাই ওদের পরম সাফল্য আর আমাদের চরম ব্যর্থতা।
আজ আমরাই লড়ছি আমাদের বিরুদ্ধে, আমরাই হত্যা করছি আমাদের ভাইকে। আমরাই ধ্বংস করছি আমাদের সম্পদ। মুসলমান ভাইয়ের জানাজা যাত্রায় আক্রমণ করছে মুসলমাননরা। চড়াও ইচ্ছে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে। হামলা চালাচ্ছে মসজিদে। হত্যা করছে নামাজরত মুসল্লিদের। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার, এর অনেকটাই করা হচ্ছে ধর্মের নামে দ্বীনি খিদমতের মুখোশে। বলা বাহুল্য, আমাদের দেশেও শুরু হয়ে গেছে সেই মরণ খেলার আবহ।ফিতনা হত্যার চেয়েও মারাত্মক। মুসলমানদের ঐক্য-সংহতি, বিনষ্ট করা, সুকৌশলে এককে অপরের দুশমন করে তোলা, দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের বীজ বপন করা, ধর্মীয় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাপারগুলো ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে আমজনতার সামনে নিয়ে আসা, বিশেষজ্ঞ আলেমদের মধ্যে আলোচ্য একাডেমিক বিষয়গুলোকে ফরজ-ওয়াজিব বিষয়গুলো থেকেও প্রাধান্য দিয়ে সাধারণের মধ্যে প্রচারে লিপ্ত হয়ে হয়ে ফিরকাবাজিতে মশগুল হওয়া- সবই বিধ্বংসী কাজের আলামত। এ কাজে যারা মশগুল তাদের নিরস্ত হওয়া দরকার, নিরস্ত করা দরকার। তারা ভেবে দেখেন কিনা জানি না, অজ্ঞতার জন্য হোক, অদূরদর্শিতার জন্য হোক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হোক তারা দ্বীনের খিদমতের নামে দ্বীনের ক্ষতিই করে চলছেন। এতোদিন এসব আলোচনা ওয়াজে বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ ছিল। এখন বিভিন্ন টিভি চ্যানেল বা ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বিশ্বব্যাপী, সর্বত্র সবখানে। এর প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে সব জায়গায়। সাধারণ মানুষ, ইসলামী শিক্ষা-বঞ্চিত মানুষ যাদের কুরআন, হাদীস, ফিক্হের জ্ঞান অর্জন করা তো দূরের কথা আরবি অক্ষরজ্ঞান পর্যন্ত নেই এমন লোকেরাও যখন বিজ্ঞ-প্রাজ্ঞ দক্ষ, মুহাক্কিক আলেম ওলামাদের বলতে শুরু করেছে, হুজুর! আপনার মাসআলাটি শুদ্ধ নয়, আপনার নামাজের পদ্ধতি কুরআন-হাদীস মোতাবেক নয়, আপনার রোজা, হজ্ব, যাকাত সম্পর্কিত তালীম মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এর বাতানো, শিখানো, নির্দেশিত শিক্ষার বিপরীত, হাদীস বিরোধী ইত্যাদি বলার ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে তখন তাকে ফিতনা না বলে আর কীইবা বলা যেতে পারে! অনেক জায়গায়ই দেখা গেছে এবং বহু জায়গা থেকে সংবাদ পাওয়া গেছে, এসব নিয়ে ব্যাপক বচসা শুরু হয়েছে। এমনকি সংঘাত-সংঘর্ষের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। মিডিয়ার প্রচারণায় বিভ্রান্ত দ্বীনি ইলমে মুর্খ শ্রোতাদের মধ্যে অনেকে আবার বলতে শুরু করেছে, তোমাদের ধর্মীয় কিতাব তো কুরআন-হাদীস নয়, ফিক্হ। তোমরা আসলে মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর উম্মতও নও, আবু হানিফার (রা.) উম্মত। ওই সেই ‘বাবু যাহা বলে পরিষদ দলে বলে তার শতগুণ’। অনেকে বলেন, অমুক মিডিয়ার, অমুক হুজুর বলেছেন, ইমাম আবু হানিফা হাদীস জানতেন না, কেউ কেউ বলছেন, তিনি মাত্র ১২ খানা হাদীস জানতেন। কাজেই কুরআন-হাদীস বাদ দিয়ে যারা তার মাজহাবের অনুসরণ করবে তারা আল্লাহ্-রাসূলকে পাবে না। তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। কী মারাত্মক কথা! কী সাংঘাতিক প্রতিক্রিয়া! সাধারণ মানুষদের এমন সব কথা বলার জন্য পরোক্ষভাবে প্ররোচিত করল কারা? আলেম-উলামাদের প্রতি এই অবিশ্বাস-অনাস্থা সৃষ্টি করার জন্য দায়ী কারা? এ ধারা যদি অব্যাহত থাকে তবে তার পরিণতি কোথায় গিয়ে গড়াবে! চরমপন্থী, উগ্রপন্থী লোক বিভিন্ন মতের অনুসারীদের মধ্যে থাকে। তারা যদি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, যদি সংঘাতে লিপ্ত হয় তবে পাকিস্তানের মতো আত্মঘাতী লড়াই শুরু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কি উড়িয়ে দেয়া যায়?
ওরা প্রচার চালাচ্ছে তোমাদের নামাজ মুহাম্মদী নামাজ নয়, হানাফী নামাজ। হানাফী আর মুহাম্মদী নামাজে নামাজকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে তারা। এদেশে মুষ্টিমেয় ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ লোক সুন্নী হানাফী। হানাফী উস্তাদই বাল্যকালে নামাজ শিখিয়েছেন তাদেরকে। নিম্ন শ্রেণী থেকে সর্বোচ্চ শ্রেণী পর্যন্ত সকল মাদরাসায় হানাফী ফিক্হ পাঠ্য তালিকাভূক্ত। পীর মাশায়েখ, ওয়ায়েজ, মুবাল্লিগ, আলেম-উলামা, মাদরাসার উস্তাদগণ প্রায় সবাই হানাফী। তারা সবাই কি হাদীসের বিপরীত ভুল নামাজের তালীম দিয়েছেন? বিভিন্ন মাসআলা শিক্ষা দিচ্ছেন? ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, কাজাখস্তান, সমরখন্দ, বোখারা, দাঘিস্তান, চেচনিয়া, ইঙ্গুশতিয়া, খোতওয়ান, তুরস্কের প্রায় সব মুসলমান হানাফী ফিক্হে অনুসারী। আরব জাহান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলমানদের মধ্যেও হানাফী ফিক্হের অনুসারীর সংখ্যা কম নয়। হাজার বছরেরও অধিককাল ধরে বিশ্বের সহস্র সহস্র মুহাদ্দিস, মুফাসসীর, ফকিহ, ইমাম, উলামায়ে দ্বীন অনুসরণ করে আসছেন যে ফিক্হের, যে ইমামে আজমের, সেই ইমামই ছিলেন হাদীস শাস্ত্রে অজ্ঞ! উনারা প্রতিদিন প্রচার করে যাচ্ছেন, সাজানো প্রশ্নকর্তার প্রহসনমূলক প্রশ্নের উত্তরে বলে যাচ্ছেন ইমামের পিছনে মুক্তাদি কেরাত তথা সূরা ফাতিহা না পড়লে নামাজই হবে না, অর্থাৎ নামাজ পড়া সত্ত্বেও হবে বেনামাজি, এর চেয়ে চরম ধৃষ্টতা আর কী হতে পারে! ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা, কেরাত পড়ার যেমন হাদীস আছে তেমনি না পড়ারও হাদীস আছে, বিশিষ্ট সাহাবীগণের আমল উভয় দিকেই আছে, রাসূলে পাক (সা.)-এর জমানা হতে আজ পর্যন্ত দু’ধরনের আমলই জারি আছে। ফকিহ সাহাবীদের, তাবেঈন, তাবেতাবেঈন, ইমাম মুজহাতিদদের নামাজ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়ার, বাতিল অশুদ্ধ বলে অপপ্রচার চালানোর অধিকার কোথা থেকে পেলেন তারা? নিজেদের সুবিধামত হাদীসটিই তারা বলেন ইমামের পিছনে মুক্তাদীদের ফাতিহা, কেরাত না পড়ার, রাফে ইয়াদাইন না করার, আমীন জোরে না বলার অসংখ্য হাদীস রয়েছে তার উল্লেখ করেন না ভুলক্রমেও। সে হাদীস সমূহ অস্বীকার ও অগ্রাহ্য করে এই যে অপপ্রচার চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা কোন ধরনের দ্বীনি খিদমত? যারা বেনামাজি তাদের নামাজি বানানোই তো ছিল দায়িত্ব, যারা নামাজ পড়ছেন তাদের সংশয়ে, সন্দেহে নিক্ষেপ করা তো দ্বীনি খিদমত হতে পারে না। বাংলাদেশের শত সহস্র মাদরাসার উচ্চ শ্রেণীসমূহে যেমন ফিক্হ পড়ানো হয় তেমনি অত্যন্ত শুরুত্বের সাথে সহীহ হাদীসের গ্রন্থসমূহ, সিহাহ্ সিত্তাহ ও অন্য হাদীস গ্রন্থ পড়ানো হয়। তাই উনারাই হাদীসবেত্তা অন্যরা হাদীস পড়ে না, জানে না, আমল করে না এমনটা ভাবা আহাম্মুকী বৈ কিছুই নয়।
ইসলামী জ্ঞান, আইন, শরীয়তের মূল উৎসই কুরআন ও হাদীস। কুরআন ও হাদীস উভয়ই ওহী। একটি ওহীয়ে মতলু আর একটি ওহীয়ে গায়ের মতলু। হাদীসকে বাদ দিলে দ্বীনের অস্তিত্বই থাকে না। তাই সকল আলেমেদ্বীনই হাদীস মানেন, হাদীস জানেন এবং হাদীস মোতাবেকই আমল করেন। হাদীস কারোর একচেটিয়া সম্পত্তি নয়, সকল মুসলমানই আহলে কুরআন, সকল মুসলমানই আহলে হাদীস। কুরআন-হাদীস দ্বারা প্রামাণিত, প্রিয় নবীর (সা.) আমলে সাহাবী, তাবেঈনদের মাধ্যমে পরস্পরায় প্রাপ্ত, ইজমায়ে উম্মাহর দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত ও সর্বসম্মত মাসআলা যেন তেন শাজ মুনকার হাদীস আউড়িয়ে উড়িয়ে দিয়ে যে কাজটি করা হচ্ছে তারই নাম ফিতনা। এ ফিতনা সৃষ্টি থেকে, ভ্রান্তবিচ্যুত রেওয়ায়েত পেশ করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপতৎপরতা থেকে তাদের এখনই বিরত হওয়া আবশ্যক। আমাদের আহবান, বিরত হোন। হিংসা-বিদ্বেষ ছড়াবেন না, আপনি ও আপনার অনুগামী অনুসারী ছাড়া অন্য সবাই ভ্রান্ত, এমন দাম্ভিক উক্তি ও প্রচারণার ফল কখনই ভালো হতে পারে না।
ইসলামের পথ সংকীর্ণ নয়, কণ্টকিত নয়, প্রশস্ত ও মসৃণ। ইলমে হাদীসের পরিসরও বিশাল। তারপরও যুগের আবর্তনে সৃষ্ট নিত্য নতুন সমস্যার সমাধানে ইজমা ও কিয়াসের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। ইমাম ও মুজতাহিদগণ কুরআন, হাদীসের ভান্ডার সামনে রেখে, ইজমায়ে উম্মত ও কিয়াসের ভিত্তিতে চলার পথ সুগম করার জন্য ইসলামী আইন-কানুন বিধি-বিধানের যে সুবিন্যস্ত শাস্ত্র উম্মতকে উপহার দিয়েছেন তারই নাম ফিকহ। যারা ফিকহের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করেন তারাও নামাজ শিখেছেন ফিকাহ্ থেকেই। প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন হযরত মাওলানা আবদুল মালিকের ‘নবীজির নামাজ’ গ্রন্থের ভূমিকায় লেখা বক্তব্যটি এক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য : ‘যদি অমুসলিমকে ইসলাম গ্রহণের পরে এবং শিশুকে বালিগ হওয়ার পর বাধ্য করা হতো যে, তোমাদেরকে নামাজ আদায়ের পদ্ধতি হাদীসের কিতাব থেকে শিখতে হবে, কারো তাকলীদ করতে পারবে না, দলিল প্রমাণের আলোকে সকল বিষয় নিজে পরীক্ষা করে নামাজ পড়বে। তাহলে বছরের পর বছর অতিবাহিত হবে কিন্তু নামাজ পড়ার সুযোগ হবে না। একই অবস্থা হবে যদি সাধারণ মানুষকে এই আদেশ করা হয়। খুব ভালো করে বুঝে নেয়া প্রয়োজন যে, কুতুবে সিত্তা বুখারী, মুসলিম, আবুদাউদ, নাসায়ী, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ও অন্যান্য প্রসিদ্ধ হাদীসগ্রন্থের সংকলক ইমামগণও প্রথমে নামাজ শিখেছেন ফিকহে ইসলামী থেকেই।’ ‘গোটা নামাজের পদ্ধতি ধারাবাহিকভাবে কোন এক হাদীসে নেই। পূর্ণ নামাজের ধারাবাহিক নিয়ম হাদীসের এক-দুই কিতাব নয়, ছয় বা দশ কিতাবেও বিদ্যমান নেই।’ নামাজের পদ্ধতি শুধু মৌখিক আলোচনার মধ্য দিয়ে শেখা যায় না। সঠিক পদ্ধতিতে সহিহ শুদ্ধভাবে নামাজ আদায় করা শিখতে হয় নামাজ আদায়কারীর নামাজ দেখে। সাহাবায়ে কেরাম শিখেছেন নবীজি (সা.)-এর নামাজ দেখে। তাবেয়ীরা শিখেছেন সাহাবায়ে কেরামের নামাজ দেখে। এভাবে যুগ পরম্পরায় চলে এসেছে আজ পর্যন্ত। আবার সাহাবায়ে কেরামের দেখা ও শেখার মধ্যে পার্থক্য আছে। বিজ্ঞতায় প্রজ্ঞায় মর্যাদায় তাদের সবাই এক সমান যেমন ছিলেন না তেমনি সর্বক্ষণ নবীজির সঙ্গে থেকে নামাজ আদায় করার সৌভাগ্য লাভ করেননি অনেকেই? আলোচনার সময় এসব তুলে ধরা দরকার। পক্ষের বিপক্ষের সব দলিলই পেশ করা দরকার। কিন্তু বিভিন্ন চ্যানেলে ধর্মীয় প্রশ্নোত্তর পর্বে মতলববাজদের দেখা যায়, কেবল নিজের গরজেরটাই বলে যান অন্য রেওয়ায়েত যে আছে তার ধারও ধারেন না।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সেদিন এক টিভি চ্যানেলে জনৈক উত্তরদাতাকে প্রশ্নোত্তরে বলতে শুনলাম : তাকবীর তাহরিমা ছাড়া নামাজের অন্য কিছু তাকবীরে রফয়ে ইয়াদাইন করতে হবে। এটাই সুন্নত তরিকা। এটা আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা)-এর হাদীস থেকে প্রমাণিত। কিন্তু হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা)-এর পিতা দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর ফারুক (রা), ৪র্থ খলিফা হযরত আলী (রাঃ), (নবীজির পরিবারের আহলে বাইতের সাথে দীর্ঘকাল ঘনিষ্ঠভাবে বসবাস করার জন্য অনেকে যাকে আহলে বাইতের সদস্য বলে ধারণা করতেন সেই) উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এবং সাহাবায়ে কেরামের এক বিরাট দল যে তাকবীর তাহরিমা ছাড়া রফয়ে ইয়াদাইন করতেন না এসব হাদীসের ধারেকাছেও গেলেন না। ইমামের পিছনে মুক্তাদির সূরা ফাতিহা কেরাত না পড়া, রফয়ে ইয়াদাইন না করা, আমীন জোরে না বলা ইত্যাদি হানাফীদের আমলগুলোও যে সুন্নতসম্মত, এর সমর্থনেও যে অনেক সহীহ্ হাদীস রয়েছে মতলববাজ মুফতীরা তার উল্লেখ তো করেনই না বরং হানাফীদের নামাজের সাথে নবী (সা.)-এর নামাজের মিল নেই, সম্পর্ক নেই এমন কথাই তাদের বলতে শোনা যায়। আসলে, উদ্দেশ্য তাদের সহীহ মাসয়ালা শেখানো নয়, উদ্দেশ্য উম্মাহ্র মধ্যে অনৈক্য, বিশৃঙ্খলা, ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করা।
এ অবস্থায় হানাফী উলামাদের এ ফিতনা-ফাসাদের মোকাবেলায় অগ্রসর হওয়া উচিত। মতলববাজরা যেসব আমলকে শিরক-বিদাত, হাদীসবিরোধী, ভিত্তিহীন, বাতিল বলে অপপ্রচার চালাছে তার মোকাবেলায় দলীল প্রমাণ তুলে ধরা দরকার। কুরআন সুন্নার মজবুত ভিত্তির ওপর যে এ মাজহাব প্রতিষ্ঠিত মসজিদে মসজিদে, মাহফিলে মাহফিলে তা পেশ করা অবশ্যক। যেটা শিরক, যেটা ঘৃণিত বিদাত যেটা ইসলাম গর্হিত কুসংস্কার অবশ্যই তার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতে হবে। কিন্তু যেটা সুন্নাত সমর্থিত, যেসব মাসআলা দলিল দ্বারা প্রমাণিত এবং যে এলাকার লোক এমন সহীহ মাসয়ালার ওপর আমল করে সেখানে অন্যমত থাকলেও তা অতি উৎসাহে প্রচারণা না করাই নিয়ম। এর দ্বারা কেবল আওয়ামের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।
ইসলামী আইনের মূল উৎস কুরআন-হাদীস হওয়া সত্ত্বেও তা অভীক্ষ অবেক্ষণে, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞ ইমামদের মধ্যে মতপার্থক্য হওয়া স্বাভাবিক। এজন্য কিছু কিছু শাখা মাসায়লে ইখতিলাফ হওয়া, থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এটা হয়ে আসছে, হতে থাকবে। ইখতিলাফ বা মতপার্থক্যতে দোষণীয় কিছু নেই। দোষ হচ্ছে ইখতিলাফকে মুখালাফাতে পরিণত করায়। দোষ হচ্ছে কুরআন, হাদীস, ইজমা, কিয়াসের দলীলে সমৃদ্ধ মাসআলা মাসায়িল, যার ওপরে এদেশের প্রায় সব মুসলমানের আমল জারি রয়েছে সেগুলোকে বেআসল, বেবুনিয়াদ বলে মিথ্যা প্রচারণায়। দোষ হচ্ছে মসনুন বিষয়গুলোকে শিরক বিদাত, মনগড়া, বানোয়াট আখ্যায়িত করায়। এসব কাজ ধ্বংসাত্মক।
বাংলাদেশের মানুষ ধর্মীয় ব্যাপারে সহিষ্ণু। বাংলাদেশের মানুষ উলামা-মাশায়েখদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাদের সাথে বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশের প্রায় সব মানুষ যুগপরস্পরায়, বংশপরস্পরায় পরম আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে নির্বিঘ্নে নিরুপদ্রবে হানাফী মাজহাব অনুসরণ করে নামাজ, রোজা, ইবাদত বন্দেগী করে আসছে। এই স্নিগ্ধ শান্ত পরিবেশ বিনষ্ট করার অপপ্রয়াসে যারা লিপ্ত হয়েছে, সংশয় সন্দেহ অবিশ্বাস অনাস্থার বীজ যারা বপন করে চলছে তারা কাদের প্রয়োজন পূরণ করছে? দেশকে ধর্মীয় সংঘাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে যারা তাদের মতলব কি? উদ্দেশ্য কি? স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, হাজার হাজার মুহাক্কিক আলেমকে সুকৌশলে ভ্রান্ত ও বিদাতী বলার দুঃসাহস, কোটি কোটি মুসলমানের সহীহ শুদ্ধ নামাজকে অশুদ্ধ বলার ধৃষ্টতা, সুন্নাত তরিকা অনুযায়ী তাদের আকিদা আমলকে শিরক বিদাত ও বাতিল বলে অপপ্রচার চালানোর ঔদ্ধত্য উনারা পেলেন কোত্থেকে? কোন্ খুঁটির জোরে তারা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের প্রতিদিন হেনে চলছে আঘাতের পর আঘাত? তা নির্ণীত হওয়া আবশ্যক। যে মুহূর্তে উম্মাহ্র ঐক্য সংহতি সবচেয়ে বেশি জরুরি, সেই মুহূর্তে ফিতনা-ফাসাদের দ্বার যারা উন্মুক্ত করে দিচ্ছে, সংঘাতের দিকে জাতিকে ঠেলে দিচ্ছে তারা আসলে কাদের লোক? এটা ভাববার সময় এসেছে। ফিতনা নয়, ফাসাদ নয়, কুরআন-হাদীসের দলীল-প্রমাণ দিয়ে তাদের মোকাবেলা করতে হবে।
সূত্র : দৈনিক ইনকিলাব, ৩ অক্টোবর, ২০১১ইং ঢাকা।
ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আড়ালে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টির অপপ্রয়াস চলছে
মাওলানা মুহাম্মদ রূহুল আমীন খান
আজ আমরাই লড়ছি আমাদের বিরুদ্ধে, আমরাই হত্যা করছি আমাদের ভাইকে। আমরাই ধ্বংস করছি আমাদের সম্পদ। মুসলমান ভাইয়ের জানাজা যাত্রায় আক্রমণ করছে মুসলমাননরা। চড়াও ইচ্ছে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে। হামলা চালাচ্ছে মসজিদে। হত্যা করছে নামাজরত মুসল্লিদের। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার, এর অনেকটাই করা হচ্ছে ধর্মের নামে দ্বীনি খিদমতের মুখোশে। বলা বাহুল্য, আমাদের দেশেও শুরু হয়ে গেছে সেই মরণ খেলার আবহ।
ফিতনা হত্যার চেয়েও মারাত্মক। মুসলমানদের ঐক্য-সংহতি, বিনষ্ট করা, সুকৌশলে এককে অপরের দুশমন করে তোলা, দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের বীজ বপন করা, ধর্মীয় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাপারগুলো ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে আমজনতার সামনে নিয়ে আসা, বিশেষজ্ঞ আলেমদের মধ্যে আলোচ্য একাডেমিক বিষয়গুলোকে ফরজ-ওয়াজিব বিষয়গুলো থেকেও প্রাধান্য দিয়ে সাধারণের মধ্যে প্রচারে লিপ্ত হয়ে হয়ে ফিরকাবাজিতে মশগুল হওয়া- সবই বিধ্বংসী কাজের আলামত। এ কাজে যারা মশগুল তাদের নিরস্ত হওয়া দরকার, নিরস্ত করা দরকার। তারা ভেবে দেখেন কিনা জানি না, অজ্ঞতার জন্য হোক, অদূরদর্শিতার জন্য হোক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হোক তারা দ্বীনের খিদমতের নামে দ্বীনের ক্ষতিই করে চলছেন। এতোদিন এসব আলোচনা ওয়াজে বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ ছিল। এখন বিভিন্ন টিভি চ্যানেল বা ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বিশ্বব্যাপী, সর্বত্র সবখানে। এর প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে সব জায়গায়। সাধারণ মানুষ, ইসলামী শিক্ষা-বঞ্চিত মানুষ যাদের কুরআন, হাদীস, ফিক্হের জ্ঞান অর্জন করা তো দূরের কথা আরবি অক্ষরজ্ঞান পর্যন্ত নেই এমন লোকেরাও যখন বিজ্ঞ-প্রাজ্ঞ দক্ষ, মুহাক্কিক আলেম ওলামাদের বলতে শুরু করেছে, হুজুর! আপনার মাসআলাটি শুদ্ধ নয়, আপনার নামাজের পদ্ধতি কুরআন-হাদীস মোতাবেক নয়, আপনার রোজা, হজ্ব, যাকাত সম্পর্কিত তালীম মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এর বাতানো, শিখানো, নির্দেশিত শিক্ষার বিপরীত, হাদীস বিরোধী ইত্যাদি বলার ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে তখন তাকে ফিতনা না বলে আর কীইবা বলা যেতে পারে! অনেক জায়গায়ই দেখা গেছে এবং বহু জায়গা থেকে সংবাদ পাওয়া গেছে, এসব নিয়ে ব্যাপক বচসা শুরু হয়েছে। এমনকি সংঘাত-সংঘর্ষের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। মিডিয়ার প্রচারণায় বিভ্রান্ত দ্বীনি ইলমে মুর্খ শ্রোতাদের মধ্যে অনেকে আবার বলতে শুরু করেছে, তোমাদের ধর্মীয় কিতাব তো কুরআন-হাদীস নয়, ফিক্হ। তোমরা আসলে মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর উম্মতও নও, আবু হানিফার (রা.) উম্মত। ওই সেই ‘বাবু যাহা বলে পরিষদ দলে বলে তার শতগুণ’। অনেকে বলেন, অমুক মিডিয়ার, অমুক হুজুর বলেছেন, ইমাম আবু হানিফা হাদীস জানতেন না, কেউ কেউ বলছেন, তিনি মাত্র ১২ খানা হাদীস জানতেন। কাজেই কুরআন-হাদীস বাদ দিয়ে যারা তার মাজহাবের অনুসরণ করবে তারা আল্লাহ্-রাসূলকে পাবে না। তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। কী মারাত্মক কথা! কী সাংঘাতিক প্রতিক্রিয়া! সাধারণ মানুষদের এমন সব কথা বলার জন্য পরোক্ষভাবে প্ররোচিত করল কারা? আলেম-উলামাদের প্রতি এই অবিশ্বাস-অনাস্থা সৃষ্টি করার জন্য দায়ী কারা? এ ধারা যদি অব্যাহত থাকে তবে তার পরিণতি কোথায় গিয়ে গড়াবে! চরমপন্থী, উগ্রপন্থী লোক বিভিন্ন মতের অনুসারীদের মধ্যে থাকে। তারা যদি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, যদি সংঘাতে লিপ্ত হয় তবে পাকিস্তানের মতো আত্মঘাতী লড়াই শুরু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কি উড়িয়ে দেয়া যায়?
ওরা প্রচার চালাচ্ছে তোমাদের নামাজ মুহাম্মদী নামাজ নয়, হানাফী নামাজ। হানাফী আর মুহাম্মদী নামাজে নামাজকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে তারা। এদেশে মুষ্টিমেয় ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ লোক সুন্নী হানাফী। হানাফী উস্তাদই বাল্যকালে নামাজ শিখিয়েছেন তাদেরকে। নিম্ন শ্রেণী থেকে সর্বোচ্চ শ্রেণী পর্যন্ত সকল মাদরাসায় হানাফী ফিক্হ পাঠ্য তালিকাভূক্ত। পীর মাশায়েখ, ওয়ায়েজ, মুবাল্লিগ, আলেম-উলামা, মাদরাসার উস্তাদগণ প্রায় সবাই হানাফী। তারা সবাই কি হাদীসের বিপরীত ভুল নামাজের তালীম দিয়েছেন? বিভিন্ন মাসআলা শিক্ষা দিচ্ছেন? ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, কাজাখস্তান, সমরখন্দ, বোখারা, দাঘিস্তান, চেচনিয়া, ইঙ্গুশতিয়া, খোতওয়ান, তুরস্কের প্রায় সব মুসলমান হানাফী ফিক্হে অনুসারী। আরব জাহান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলমানদের মধ্যেও হানাফী ফিক্হের অনুসারীর সংখ্যা কম নয়। হাজার বছরেরও অধিককাল ধরে বিশ্বের সহস্র সহস্র মুহাদ্দিস, মুফাসসীর, ফকিহ, ইমাম, উলামায়ে দ্বীন অনুসরণ করে আসছেন যে ফিক্হের, যে ইমামে আজমের, সেই ইমামই ছিলেন হাদীস শাস্ত্রে অজ্ঞ! উনারা প্রতিদিন প্রচার করে যাচ্ছেন, সাজানো প্রশ্নকর্তার প্রহসনমূলক প্রশ্নের উত্তরে বলে যাচ্ছেন ইমামের পিছনে মুক্তাদি কেরাত তথা সূরা ফাতিহা না পড়লে নামাজই হবে না, অর্থাৎ নামাজ পড়া সত্ত্বেও হবে বেনামাজি, এর চেয়ে চরম ধৃষ্টতা আর কী হতে পারে! ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা, কেরাত পড়ার যেমন হাদীস আছে তেমনি না পড়ারও হাদীস আছে, বিশিষ্ট সাহাবীগণের আমল উভয় দিকেই আছে, রাসূলে পাক (সা.)-এর জমানা হতে আজ পর্যন্ত দু’ধরনের আমলই জারি আছে। ফকিহ সাহাবীদের, তাবেঈন, তাবেতাবেঈন, ইমাম মুজহাতিদদের নামাজ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়ার, বাতিল অশুদ্ধ বলে অপপ্রচার চালানোর অধিকার কোথা থেকে পেলেন তারা? নিজেদের সুবিধামত হাদীসটিই তারা বলেন ইমামের পিছনে মুক্তাদীদের ফাতিহা, কেরাত না পড়ার, রাফে ইয়াদাইন না করার, আমীন জোরে না বলার অসংখ্য হাদীস রয়েছে তার উল্লেখ করেন না ভুলক্রমেও। সে হাদীস সমূহ অস্বীকার ও অগ্রাহ্য করে এই যে অপপ্রচার চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা কোন ধরনের দ্বীনি খিদমত? যারা বেনামাজি তাদের নামাজি বানানোই তো ছিল দায়িত্ব, যারা নামাজ পড়ছেন তাদের সংশয়ে, সন্দেহে নিক্ষেপ করা তো দ্বীনি খিদমত হতে পারে না। বাংলাদেশের শত সহস্র মাদরাসার উচ্চ শ্রেণীসমূহে যেমন ফিক্হ পড়ানো হয় তেমনি অত্যন্ত শুরুত্বের সাথে সহীহ হাদীসের গ্রন্থসমূহ, সিহাহ্ সিত্তাহ ও অন্য হাদীস গ্রন্থ পড়ানো হয়। তাই উনারাই হাদীসবেত্তা অন্যরা হাদীস পড়ে না, জানে না, আমল করে না এমনটা ভাবা আহাম্মুকী বৈ কিছুই নয়।
ইসলামী জ্ঞান, আইন, শরীয়তের মূল উৎসই কুরআন ও হাদীস। কুরআন ও হাদীস উভয়ই ওহী। একটি ওহীয়ে মতলু আর একটি ওহীয়ে গায়ের মতলু। হাদীসকে বাদ দিলে দ্বীনের অস্তিত্বই থাকে না। তাই সকল আলেমেদ্বীনই হাদীস মানেন, হাদীস জানেন এবং হাদীস মোতাবেকই আমল করেন। হাদীস কারোর একচেটিয়া সম্পত্তি নয়, সকল মুসলমানই আহলে কুরআন, সকল মুসলমানই আহলে হাদীস। কুরআন-হাদীস দ্বারা প্রামাণিত, প্রিয় নবীর (সা.) আমলে সাহাবী, তাবেঈনদের মাধ্যমে পরস্পরায় প্রাপ্ত, ইজমায়ে উম্মাহর দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত ও সর্বসম্মত মাসআলা যেন তেন শাজ মুনকার হাদীস আউড়িয়ে উড়িয়ে দিয়ে যে কাজটি করা হচ্ছে তারই নাম ফিতনা। এ ফিতনা সৃষ্টি থেকে, ভ্রান্তবিচ্যুত রেওয়ায়েত পেশ করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপতৎপরতা থেকে তাদের এখনই বিরত হওয়া আবশ্যক। আমাদের আহবান, বিরত হোন। হিংসা-বিদ্বেষ ছড়াবেন না, আপনি ও আপনার অনুগামী অনুসারী ছাড়া অন্য সবাই ভ্রান্ত, এমন দাম্ভিক উক্তি ও প্রচারণার ফল কখনই ভালো হতে পারে না।
ইসলামের পথ সংকীর্ণ নয়, কণ্টকিত নয়, প্রশস্ত ও মসৃণ। ইলমে হাদীসের পরিসরও বিশাল। তারপরও যুগের আবর্তনে সৃষ্ট নিত্য নতুন সমস্যার সমাধানে ইজমা ও কিয়াসের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। ইমাম ও মুজতাহিদগণ কুরআন, হাদীসের ভান্ডার সামনে রেখে, ইজমায়ে উম্মত ও কিয়াসের ভিত্তিতে চলার পথ সুগম করার জন্য ইসলামী আইন-কানুন বিধি-বিধানের যে সুবিন্যস্ত শাস্ত্র উম্মতকে উপহার দিয়েছেন তারই নাম ফিকহ। যারা ফিকহের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করেন তারাও নামাজ শিখেছেন ফিকাহ্ থেকেই। প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন হযরত মাওলানা আবদুল মালিকের ‘নবীজির নামাজ’ গ্রন্থের ভূমিকায় লেখা বক্তব্যটি এক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য : ‘যদি অমুসলিমকে ইসলাম গ্রহণের পরে এবং শিশুকে বালিগ হওয়ার পর বাধ্য করা হতো যে, তোমাদেরকে নামাজ আদায়ের পদ্ধতি হাদীসের কিতাব থেকে শিখতে হবে, কারো তাকলীদ করতে পারবে না, দলিল প্রমাণের আলোকে সকল বিষয় নিজে পরীক্ষা করে নামাজ পড়বে। তাহলে বছরের পর বছর অতিবাহিত হবে কিন্তু নামাজ পড়ার সুযোগ হবে না। একই অবস্থা হবে যদি সাধারণ মানুষকে এই আদেশ করা হয়। খুব ভালো করে বুঝে নেয়া প্রয়োজন যে, কুতুবে সিত্তা বুখারী, মুসলিম, আবুদাউদ, নাসায়ী, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ও অন্যান্য প্রসিদ্ধ হাদীসগ্রন্থের সংকলক ইমামগণও প্রথমে নামাজ শিখেছেন ফিকহে ইসলামী থেকেই।’ ‘গোটা নামাজের পদ্ধতি ধারাবাহিকভাবে কোন এক হাদীসে নেই। পূর্ণ নামাজের ধারাবাহিক নিয়ম হাদীসের এক-দুই কিতাব নয়, ছয় বা দশ কিতাবেও বিদ্যমান নেই।’ নামাজের পদ্ধতি শুধু মৌখিক আলোচনার মধ্য দিয়ে শেখা যায় না। সঠিক পদ্ধতিতে সহিহ শুদ্ধভাবে নামাজ আদায় করা শিখতে হয় নামাজ আদায়কারীর নামাজ দেখে। সাহাবায়ে কেরাম শিখেছেন নবীজি (সা.)-এর নামাজ দেখে। তাবেয়ীরা শিখেছেন সাহাবায়ে কেরামের নামাজ দেখে। এভাবে যুগ পরম্পরায় চলে এসেছে আজ পর্যন্ত। আবার সাহাবায়ে কেরামের দেখা ও শেখার মধ্যে পার্থক্য আছে। বিজ্ঞতায় প্রজ্ঞায় মর্যাদায় তাদের সবাই এক সমান যেমন ছিলেন না তেমনি সর্বক্ষণ নবীজির সঙ্গে থেকে নামাজ আদায় করার সৌভাগ্য লাভ করেননি অনেকেই? আলোচনার সময় এসব তুলে ধরা দরকার। পক্ষের বিপক্ষের সব দলিলই পেশ করা দরকার। কিন্তু বিভিন্ন চ্যানেলে ধর্মীয় প্রশ্নোত্তর পর্বে মতলববাজদের দেখা যায়, কেবল নিজের গরজেরটাই বলে যান অন্য রেওয়ায়েত যে আছে তার ধারও ধারেন না।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সেদিন এক টিভি চ্যানেলে জনৈক উত্তরদাতাকে প্রশ্নোত্তরে বলতে শুনলাম : তাকবীর তাহরিমা ছাড়া নামাজের অন্য কিছু তাকবীরে রফয়ে ইয়াদাইন করতে হবে। এটাই সুন্নত তরিকা। এটা আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা)-এর হাদীস থেকে প্রমাণিত। কিন্তু হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা)-এর পিতা দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর ফারুক (রা), ৪র্থ খলিফা হযরত আলী (রাঃ), (নবীজির পরিবারের আহলে বাইতের সাথে দীর্ঘকাল ঘনিষ্ঠভাবে বসবাস করার জন্য অনেকে যাকে আহলে বাইতের সদস্য বলে ধারণা করতেন সেই) উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এবং সাহাবায়ে কেরামের এক বিরাট দল যে তাকবীর তাহরিমা ছাড়া রফয়ে ইয়াদাইন করতেন না এসব হাদীসের ধারেকাছেও গেলেন না। ইমামের পিছনে মুক্তাদির সূরা ফাতিহা কেরাত না পড়া, রফয়ে ইয়াদাইন না করা, আমীন জোরে না বলা ইত্যাদি হানাফীদের আমলগুলোও যে সুন্নতসম্মত, এর সমর্থনেও যে অনেক সহীহ্ হাদীস রয়েছে মতলববাজ মুফতীরা তার উল্লেখ তো করেনই না বরং হানাফীদের নামাজের সাথে নবী (সা.)-এর নামাজের মিল নেই, সম্পর্ক নেই এমন কথাই তাদের বলতে শোনা যায়। আসলে, উদ্দেশ্য তাদের সহীহ মাসয়ালা শেখানো নয়, উদ্দেশ্য উম্মাহ্র মধ্যে অনৈক্য, বিশৃঙ্খলা, ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করা।
এ অবস্থায় হানাফী উলামাদের এ ফিতনা-ফাসাদের মোকাবেলায় অগ্রসর হওয়া উচিত। মতলববাজরা যেসব আমলকে শিরক-বিদাত, হাদীসবিরোধী, ভিত্তিহীন, বাতিল বলে অপপ্রচার চালাছে তার মোকাবেলায় দলীল প্রমাণ তুলে ধরা দরকার। কুরআন সুন্নার মজবুত ভিত্তির ওপর যে এ মাজহাব প্রতিষ্ঠিত মসজিদে মসজিদে, মাহফিলে মাহফিলে তা পেশ করা অবশ্যক। যেটা শিরক, যেটা ঘৃণিত বিদাত যেটা ইসলাম গর্হিত কুসংস্কার অবশ্যই তার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতে হবে। কিন্তু যেটা সুন্নাত সমর্থিত, যেসব মাসআলা দলিল দ্বারা প্রমাণিত এবং যে এলাকার লোক এমন সহীহ মাসয়ালার ওপর আমল করে সেখানে অন্যমত থাকলেও তা অতি উৎসাহে প্রচারণা না করাই নিয়ম। এর দ্বারা কেবল আওয়ামের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।
ইসলামী আইনের মূল উৎস কুরআন-হাদীস হওয়া সত্ত্বেও তা অভীক্ষ অবেক্ষণে, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞ ইমামদের মধ্যে মতপার্থক্য হওয়া স্বাভাবিক। এজন্য কিছু কিছু শাখা মাসায়লে ইখতিলাফ হওয়া, থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এটা হয়ে আসছে, হতে থাকবে। ইখতিলাফ বা মতপার্থক্যতে দোষণীয় কিছু নেই। দোষ হচ্ছে ইখতিলাফকে মুখালাফাতে পরিণত করায়। দোষ হচ্ছে কুরআন, হাদীস, ইজমা, কিয়াসের দলীলে সমৃদ্ধ মাসআলা মাসায়িল, যার ওপরে এদেশের প্রায় সব মুসলমানের আমল জারি রয়েছে সেগুলোকে বেআসল, বেবুনিয়াদ বলে মিথ্যা প্রচারণায়। দোষ হচ্ছে মসনুন বিষয়গুলোকে শিরক বিদাত, মনগড়া, বানোয়াট আখ্যায়িত করায়। এসব কাজ ধ্বংসাত্মক।
বাংলাদেশের মানুষ ধর্মীয় ব্যাপারে সহিষ্ণু। বাংলাদেশের মানুষ উলামা-মাশায়েখদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাদের সাথে বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশের প্রায় সব মানুষ যুগপরস্পরায়, বংশপরস্পরায় পরম আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে নির্বিঘ্নে নিরুপদ্রবে হানাফী মাজহাব অনুসরণ করে নামাজ, রোজা, ইবাদত বন্দেগী করে আসছে। এই স্নিগ্ধ শান্ত পরিবেশ বিনষ্ট করার অপপ্রয়াসে যারা লিপ্ত হয়েছে, সংশয় সন্দেহ অবিশ্বাস অনাস্থার বীজ যারা বপন করে চলছে তারা কাদের প্রয়োজন পূরণ করছে? দেশকে ধর্মীয় সংঘাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে যারা তাদের মতলব কি? উদ্দেশ্য কি? স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, হাজার হাজার মুহাক্কিক আলেমকে সুকৌশলে ভ্রান্ত ও বিদাতী বলার দুঃসাহস, কোটি কোটি মুসলমানের সহীহ শুদ্ধ নামাজকে অশুদ্ধ বলার ধৃষ্টতা, সুন্নাত তরিকা অনুযায়ী তাদের আকিদা আমলকে শিরক বিদাত ও বাতিল বলে অপপ্রচার চালানোর ঔদ্ধত্য উনারা পেলেন কোত্থেকে? কোন্ খুঁটির জোরে তারা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের প্রতিদিন হেনে চলছে আঘাতের পর আঘাত? তা নির্ণীত হওয়া আবশ্যক। যে মুহূর্তে উম্মাহ্র ঐক্য সংহতি সবচেয়ে বেশি জরুরি, সেই মুহূর্তে ফিতনা-ফাসাদের দ্বার যারা উন্মুক্ত করে দিচ্ছে, সংঘাতের দিকে জাতিকে ঠেলে দিচ্ছে তারা আসলে কাদের লোক? এটা ভাববার সময় এসেছে। ফিতনা নয়, ফাসাদ নয়, কুরআন-হাদীসের দলীল-প্রমাণ দিয়ে তাদের মোকাবেলা করতে হবে।
সূত্র : দৈনিক ইনকিলাব, ৩ অক্টোবর, ২০১১ইং ঢাকা।
2 0 0 0 21
Subscribe to:
Posts (Atom)