Showing posts with label হানাফি মাযহাব. Show all posts
Showing posts with label হানাফি মাযহাব. Show all posts

Thursday, September 19, 2013

সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহঃ) ও হানাফী মাযহাব

সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহঃ) ও হানাফী মাযহাব


সাবেক আমিরে জামায়াত অধ্যাপক গোলাম আজম বলেন, “মাওলানা মাওদুদী হানাফী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। জামায়াতের মধ্যে আহলে হাদীসের লোকও রয়েছে” (ইকামাতে দ্বীন, জামায়াতে ইসলামী ও মাওলানা মাওদূদী(রহ:) অধ্যায়)। এছাড়া কোরআন ও সহীহ হাদীসের ভিত্তিতে ইমাম আবু হানীফা (রহ:) মাসয়ালা নির্ধারণ করেছেন। তিনি বলেছেন: ইযা ছোয়াহ্হাল হাদীছু ফাহুয়া মাযহাবী অর্থাৎ “সহীহ হাদীসই আমার মাযহাব হিসাবে গণ্য”(বিরুদ্ধবাদীরা একথাকে উল্টো অর্থে গ্রহণ করে মিথ্যাচার করেন)। ইমাম আবু হানীফা (রহ:) নিজে তাবেয়ী ছিলেন ( তিনি ৮০হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং সর্বশেষ সাহাবী ইন্তেকাল করেন ১১০ হিজরীতে)। আর তিনি মতান্তরে ৩৬/৪০জন তাবেয়ীর দ্বারা  টীম গঠন করে এদের মাধ্যমে মাসয়ালা নির্ধারণ করতেন। অতএব কোরআন-হাদীস অনুসরণের ক্ষেত্রে হানাফী মাযহাবই অধিকতর নির্ভরযোগ্য।  এছাড়া বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ হানাফী মাযহাব অনুসরণ করে। অতএব অধিকতর নির্ভরযোগ্য ও সহীহ রাস্তা পরিত্যাগ করে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের বৃহত্তর জনগণ থেকে বিাচ্ছন্ন করার ভ্রান্ত তৎপরতা থেকে বিরত থাকা উচিত।

Related Link:
 ইমাম আবু হানীফা (রহ.) তাবেয়ী ছিলেন। 
ইমাম আবু হানীফা রাহ. হাফিযুল হাদীসও ছিলেন : একটি প্রশ্ন ও তার উত্তর 
হাদীস শাস্ত্রে ইমাম আবু হানীফা (রহ.) 


আল্লামা মওদুদী (রাহঃ)-এর নিকট এক ব্যক্তি প্রশ্নের সুরে বলেন, "রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তো একটি পদ্ধতিতেই নামায আদায় করেছেন। কিন্তু লোকেরা যে বিভিন্ন পদ্ধতিতে নামায পড়ছে, ইসলামে এর স্থান কোথায়? আমি জানতে চাই কোন ফেরকা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর পদ্ধতিতে নামায পড়ছে? আপনি কোন পদ্ধতিতে নামায পড়েন?
জবাবে আল্লামা মওদুদী রাহঃ বলেন, আহলে হাদীস, হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলীগণ যেসব পদ্ধতিতে নামায পড়েন, তার সবগুলোই নবী (সাঃ) থেকে প্রমাণিত। এ জন্য তাদের কোনো একটি দলের শ্রেষ্ঠ আলেমগণ কখনো এ কথা বলেনি যে, তাদের পদ্ধতি ছাড়া অন্য পদ্ধতিতে যারা নামায পড়ে তাদের নামায হয় না। এ ধরণের কথা বলা তো কেবল অজ্ঞ লোকদের কাজ।.... আমি নিজে হানাফী পদ্ধতিতে নামায পড়ি। কিন্তু আহলে হাদীস, হানাফী, মালেকী ও হাম্বলী সবার নামাযকে সহীহ ও সঠিক মনে করি। এদের সবার পিছনে আমি নামায পড়ে থাকি। (রাসায়েল ও মাসায়েল, পৃঃ ২/২৪০)


Wednesday, September 18, 2013

মাযহাব ও হানাফী মাযহাব: অভিযোগের জবাব ও অন্যান্য


- মুফতী মিজানুর রহমান সাইয়েদের  আলোচনার অংশবিশেষ



নামাযে কিয়াম অবস্থায় কোথায় হাত রাখা সুন্নাত?




ইমামের পিছনে মুক্তাদীর সুরা ফাতিহা পড়া আর না পড়া




মুক্তাদি সূরা ফাতিহা পড়বে না (Trailer) - শায়খ গোলামুর রহমান


আস্তে আমীন, জোরে আমীন




                          
                          নামাযে পা ফাঁকা করে দাড়ানোর বিধান কি?



Thursday, July 25, 2013

হানাফী মাযহাবের সাথে ইমাম বুখারীর সম্পর্ক

হানাফী মাযহাবের সাথে ইমাম বুখারীর সম্পর্ক

 - তারেক

 

এই পোস্টে আমরা ইমাম বুখারীর সাথে হানাফী মাযহাবের সম্পর্ক কেমন, তা একটু দেখব ইনশাল্লাহ।

১।ইমাম বুখারীর নাম হল-মুহাম্মদ বিন ইসমাইল রহঃ। ইমাম বুখারীর পিতার নাম হল ইসমাইল। সিয়ারু আলামিন নুবালা নামক রিজালশাস্ত্রের গ্রন্থে ইমাম বুখারী রহঃ এর বরাতে বর্ণনা করা হয়েছে-

إسحاق بن أحمد بن خلف، أنه سمع البخاري يقول: سمع أبي من مالك بن أنس، ورأى حماد بن زيد، وصافح ابن المبارك بكلتا يديه (سير اعلام النبلاء، الطبقة الرابعة عشر، أبو عبد الله البخاري، رقم -171)

অনুবাদ-ইসহাক বিন আহমাদ খালফ বলেন-আমি ইমাম বুখারী রহঃ কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন-আমার পিতা মালেক বিন আনাস থেকে শুনেছেন, আর তিনি হাম্মাদ বিন জায়েদকে দেখেছেন, আর তিনি ইবনুল মুবারকের সাথে দুই হাতে মুসাফাহা করেছেন।

{সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৪ তম তবক্বা, নং-১৭১, রাবী ইমাম বুখারী}

ইমাম বুখারীর পিতা ইবনুল মুবারক রহঃ এর সাথে দুই হাতে মুসাফাহা করেছেন। হানাফী মাযহাবেও দুই হাতে মুসাফাহা করার কথা বলা হয়েছে।

২।

ইমাম বুখারী সর্বপ্রথম উস্তাদ কে? পাঁচ বছর বয়সে তার পিতা তাকে কুরআন পড়ান।

ক) তারপর সর্বপ্রথম মক্কী বিন ইবরাহীম রহঃ এর কিতাব পড়েন।
খ) ইমাম আব্দুল্লাহ বিন মুবারকের কিতাব পড়েন।
গ) ইমাম সুফিয়ান সাওরীর আল জামেউল কুবরা পড়েন।
ঘ) আবু হাফস রহঃ এ কিতাব পড়েন।

এখানে লক্ষ্য করুন মক্বী বিন ইবরাহীম ইমাম আবু হানীফা রহঃ এ ছাত্র।
আব্দুল্লাহ বিন মুবারক রহঃ ও ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্র ।
ইমাম সুফিয়ান সাওরীও হানাফী।
ইমাম আবু হাফস রহঃ হানাফী।

তাহলে ইমাম বুখারী রহঃ এর পড়াশোনা শুরু হানাফী মাযহাবের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কিতাব পড়ার মাধ্যমে। যার কাছে পড়েছেন তিনিও ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্র।

৩।

ক) ইমাম বুখারী রহঃ এর বয়স যখন ১৫/১৬ বছর হয় তখন আরো পড়াশোনা করার জন্য ২১০ হিজরীতে নিজের পিতার ও তার ভাই আহমাদের সাথে মক্কায় গিয়ে হজ্ব করেন। তারপর সেখানে হাদীস পড়েন, তাদের মাঝে সবচেয়ে বড় উস্তাদ হল আবু আব্দুর রহমান আল মুকরীর কাছে। যিনি হলেন ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্র।

খ) ইমাম বুখারী যখন বসরায় গেলেন। তখন সেখানে যাদের কাছে হাদীস পড়েন, তাদের মাঝে বড় উস্তাদ হলেন ইমাম আবু আসেম রহঃ, যিনি ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্র।

তারপর আরো একজন বড় উস্তাদ হলেন-মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আল আনসারী রহঃ। তিনিও আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্র।

গ) তারপর কুফা গেলেন সেখানে যাদের কাছে কিতাব পড়লেন, তাদের মাঝে বড় উস্তাদ হলেন উবায়দুল্লাহ বিন মুসা। তিনিও ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্র।

আরেক উস্তাদের নাম আবুল ফুজাইল রহঃ তিনিও ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্র।

ঘ) তারপর পড়ার জন্য বাগদাদ গেলেন, সেখানে যাদের কাছে পড়েছেন। তাদের মাঝে বড় উস্তাদের নাম হল ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহঃ। যিনি ইমাম আবু ইউসুফ রহঃ এর ছাত্র। আর ইমাম আবু ইউসুফ রহঃ ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর খাস ছাত্র।

লক্ষ্য করুন ইমাম বুখারী রহঃ নিজের শহরে পড়াশোনা করেছেন তো ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্রদের কাছে পড়েছেন। অন্য শহরে গিয়ে পড়াশোনো করেছেন ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্রদের কাছেই পড়েছেন।

কুফা নগরীর সাথে ইমাম বুখারীর সম্পর্কঃ

ইমাম বুখারী (রহঃ) যেসব শহরে গিয়েছেন তার মাঝে কুফা নগরীতে তিনি সবচেয়ে বেশি গিয়েছেন। সেখান থেকে সবচেয়ে বেশি ইলম অর্জন করেছেন। এজন্য বুখারীর পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় কুফী রাবী বিদ্যমান।

অথচ কুফার বিরুদ্ধাচারনকারীরা কার বিরুদ্ধাচরণ করছে নিজেরা বুঝতেও পারে না।

কুফাকে আবাদকারী হলেন হযরত সাদ বিন আবী ওয়াক্বাস।

আবাদের নির্দেশকারী হযরত ওমর রাঃ।

আবাদ করার জন্য প্রথম আমীর হিসেবে কুফায় আসেন তিনি হলেন আম্মার বিন ইয়াসির রাঃ।

সেখানের প্রথম শিক্ষক হলেন আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ।

যারা প্রথমে আবাদ করেছেন ১০৫০ সাহাবীদের মাঝে ৭০ জনই বদরী সাহাবী। আর ৩১৩ জন রাসূল সাঃ এর সাথে হজ্বকারী সাহাবী।

তাহলে কুফা আবাদ করার হুকুম দিলেন খলীফায়ে রাশেদ রাসূল সাঃ এর প্রিয় সাহাবী হযরত ওমর বিন খাত্তাব রাঃ।

কুফা আবাদকারী হলেন নবীজী সাঃ এর সাহাবী সাদ বিন আবী ওয়াক্কাস রাঃ।

প্রথম আমীর আম্মার বিন ইয়াসীর রাঃ।

প্রথম শিক্ষক আব্দুল্লা্হ বিন মাসউদ রাঃ।

আবাদকারী সাহাবীদের মাঝে ৭০ জন বদরী সাহাবী। আর ৩১৩ জন রাসূল সাঃ এর সাথে হুদায়বিয়ার সন্ধিতে অংশগ্রহণকারী সাহাবী।

সুতরাং কুফার বদনাম করলে মূলত কার বদনাম করা হয়? বদনামতো প্রতিষ্ঠানের হয় না, হয় প্রতিষ্ঠাতার। তাহলে কুফার বদনাম করা মানে হল কুফা প্রতিষ্ঠাতার উপর বদনাম করা।

কথিত আহলে হাদীসরা একটি খোড়া যুক্তি দাঁড় করিয়ে থাকে যে, কুফাতে হযরত হুসাইন রাঃ শহীদ হয়েছেন তাই এটি অভিশপ্ত ভূমি।

কোন এলাকায় আল্লাহর কোন প্রিয় বান্দা শহীদ হলে বা কষ্ট পেলে সে স্থান যদি অভিশপ্ত হয়, তাহলে মক্কাও অভিশপ্ত হয়ে যাবে, নাউজুবিল্লাহ। কারণ মক্কায় রাসূল সাঃ কে অনেক কষ্ট দেয়া হয়েছে।

ওহুদে ৭০ জন সাহাবী শহীদ হয়েছেন।

রাসূল সাঃ এর মিম্বরে হযরত ওমর রাঃ শহীদ হয়েছেন।

মদীনার মিম্বরে হযরত উসমান রাঃ শহীদ হয়েছেন।

তায়েফে রসূল (সঃ) এর উপর আক্রমণ হয়েছে।

তাই এখন বলুন, মক্কা-মদীনা, উহুদ, তায়েফের বদনাম করাটা কতটা বুদ্ধিমানের কাজ? না চূড়ান্ত পর্যায়ের বোকামী?

তেমনি হযরত হুসাইন রাঃ শহীদ হওয়ার কারণে কুফাকে বদনাম করা যাবে না। যারা শহীদ করেছেন তাদের বদনাম হতে পারে, কিন্তু যেখানে শহীদ হয়েছেন সে স্থানের বদনাম করাটা চূড়ান্ত পর্যায়ের আহমকীর নিদর্শন।

এবার দেখুন কুফার সাথে ইমাম বুখারীর কতটা সম্পর্ক?

ইমাম বুখারী রহঃ নিজেই বলেন-

قال البخاري دخلت إلى الشام ومصر والجزيرة مرتين وإلى البصرة أربع مرات وأقمت بالحجاز ستة أعوام ولا أحصي كم دخلت إلى الكوفة وبغداد مع المحدثين (مقدمة فتح البارى، كتاب البيوع الى السلم، ذكر عدة ما لكل صحابي في صحيح البخاري موصولا ومعلقا على ترتيب حروف المعجم-1/147)

আমি সিরিয়াতে এবং মিশরে ও জাজিরাতুল আরবে গিয়েছি ৪ বার। আর হেজাযে অবস্থান করেছি ৬ বছর। আর কতবার যে কুফা আর বাগদাদে মুহাদ্দিসদের সাথে গিয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই।

{মুকাদ্দিমায়ে ফাতহুল বারী)

ইমাম বুখারী হেজাযে কতদিন ছিলেন মনে আছে, মিশর, সিরিয়া ও জাজিরাতুল আরবে কতবার গেছেন মনে আছে। কিন্তু কুফা আর বাগদাদের কত অগণীত বার গেছেন তা আধিক্যের কারণে তিনি ভুলেই গেছেন।

একথা সুষ্পষ্ট প্রমাণ করে ইমাম বুখারী রহঃ এর কুফার সাথে তার ইলমী নিসবত কতটা গভীর ছিল। একারণেই বুখারী শরীফের এমন পৃষ্ঠা খুব কমই আছে যাতে কুফী বর্ণনাকারী নেই। পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় কুফী রাবী। এটাও সুষ্পষ্ট প্রমাণ ইমাম বুখারী কুফার প্রতি কতটা কৃতজ্ঞ।

সুতরাং বুঝা গেল কুফার ভক্ত ছিলেন ইমাম বুখারী। বিদ্বেষী নয়। তাই ইমাম বুখারী হানাফী মাযহাবের প্রাণকেন্দ্রের ভক্ত ও ঋণী।

ইমাম যাদের কাছে পড়েছেন তাদের সম্পর্ক হানাফীদের সাথে। যেসব শহরে গিয়েছেন তাদের সাথেও হানাফীদের সম্পর্ক।

৪।

ইমাম বুখারী রহঃ পড়াশোনা শেষ করে যখন লেখালেখি ও পড়ানো শুরু করেন, তখন তিনি যত কিতাব লিখেছেন তার মাঝে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ কিতাবের নাম হল বুখারী শরীফ। বুখারী শরীফের দিকে আমরা একটু নজর দেই।

বুখারীতে শাওয়াহেদ, মুরসালসহ সর্বমোট ৯০০৮২ বর্ণনা আছে। সনদের মাঝে বুখারী রহঃ যার কাছ থেকে হাদীস নিয়েছেন তিনি হলেন ইমাম বুখারী রহঃ এর শায়েখ। আর সনদের সর্বশেষে যিনি হন তিনি হন সাহাবী রাঃ।

বুখারীতে এমন বর্ণনা অনেক আছে যাতে ইমাম বুখারীর শায়েখ ও কুফী এবং হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীও কুফাতে অবস্থানকারী। শুধু তাই নয়, এমন বর্ণনাও আছে যার প্রতিটি বর্ণনাকারী কুফী। যেমন-

392 – حدثنا عثمان قال حدثنا جرير عن منصور عن إبراهيم عن علقمة قال قال عبد الله : صلى النبي صلى الله عليه و سلم – قال إبراهيم لا أدري – زاد أو نقص الخ (صحيح البخارى، كتاب الصلاة، باب التوجه نحو القبلة حيث كان، رقم الحديث-392)

বুখারীর এ বর্ণনাটিতে লক্ষ্য করুন-

ইমাম বুখারীর শায়েখ উসমান,
তার শায়েখ জারীর,
তার শায়েখ মানসুর,
তার শায়েখ ইবরাহীম নাখয়ী,
তার শায়েখ আলকামা,
তার শায়েখ আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ।

এ হাদীসের সনদের ৬ জন রাবী আছে। আর ৬ জনই কুফী রাবী।

শুধু কি তাই? বুখারী শরীফের সর্বশেষ হাদীসের সনদের দিকে লক্ষ্য করুন-

7124 – حدثنا أحمد بن إشكاب حدثنا محمد بن فضيل عن عمارة بن القعقاع عن أبي زرعة عن أبي هريرة رضي الله عنه قال : قال النبي صلى الله عليه و سلم ( كلمتان حبيبتان إلى الرحمن خفيفتان على اللسان ثقيلتان في الميزان سبحان الله وبحمده سبحان الله العظيم )

এ হাদীসের সনদের শুধুমাত্র হযরত আবু হুরায়রা রাঃ ছাড়া বাকি সকল রাবী কুফী।

আহমাদ বিন ইশকাব,
মুহাম্মদ বিন ফুযাইল,
আমারা বিন কা’কা’ ,
আবু জুরআ সবাই কুফী।

সুতরাং বুঝা গেল যে, ইমাম যাদের কাছে পড়েছেন তারাও কুফী। যাদের সনদের হাদীস এনেছেন তারাও কুফী। ইমাম বুখারী রহঃ এর সাথে কুফার সম্পর্ক নিবিড়।

৫।

ইমাম বুখারী রহঃ বুখারীতে যেসব হাদীস এনেছেন সনদ সহকারে, তাতে ৫ সনদও আছে। ৪ সনদও আছে। ৩ সনদও আছে। ইমাম বুখারী রহঃ এর সবচেয়ে গর্ব হল ৩ সনদের উপর। সনদ কম হলে হাদীসের মাঝে শক্তিমত্বা বেশি হওয়ায় ইমাম বুখারী সুলাসিয়াত তথা ৩ সনদওয়ালা হাদীসের উপর গর্ব আছে। এবার দেখুন সেসব সুলাসিয়্যাতের কি হাল?

বুখারীতে মোট সুলাসিয়্যাত হল ২২ টি।

এ ২২টি সুলাসিয়্যাতের ১১টি সনদে ইমাম বুখারী রহঃ এর শায়েখ হলেন-মক্বী বিন ইবরাহীম। যিনি ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্র।

এর মাঝে ৬ টি হাদীদের বর্ণনাকারী রাবী হলেন-আবু আসেম আন নাবীল রহঃ। তিনিও ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্র।

এর মাঝে ৩ তিনটি হাদীসের বর্ণনাকারী রাবী মুহাম্মদুল্লাহ আব্দুল্লাহ বিন আনসারী। যিনি ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্র।

এর মাঝে একটি হাদীসের বর্ণনাকারী রাবী হযরত হাম্মাদ বিন ইয়াহইয়া রহঃ। তিনি কুফী তথা কুফায় অবস্থানকারী ব্যক্তি।

এর মাঝে একজন রাবী হলেন ইসাম বিন খালেদ আল হিমসী। যিনি হেমসের অধিবাসী।

এবার লক্ষ্য করুন-ইমাম বুখারী রহঃ যে সুলাসিয়্যাতের উপর গর্ব, সেই ২২ টি সুলাসিয়্যাতের ২০টির বর্ণনাকারী ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্রের। আর একটি ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর নিজের এলাকা কুফার। আর একজন শুধুমাত্র হেমসের অধিবাসী। তাহলে ইমাম বুখারী গর্ব করতে চান তো ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ছাত্র ছাড়া করতেই পারেন না।

৬।

ইমাম আবু হানীফা রহঃ মদীনার ইলম পর্যন্ত আমাদের পৌছিয়েছেন সনদসহ। ইমাম বুখারী রহঃ ও মদীনার ইলম পর্যন্ত পৌঁছিয়েছেন সনদসহ।

লক্ষ্য করুন ইমাম বুখারী রহঃ এর মদীনায় নিয়ে যাওয়ার সনদ-

حدثنا أحمد بن إشكاب حدثنا محمد بن فضيل عن عمارة بن القعقاع عن أبي زرعة عن أبي هريرة رضي الله عنه قال : قال النبي صلى الله عليه و سلم

ইমাম বুখারী রহঃ রাসূল সাঃ পর্যন্ত সনদ পৌঁছাতে মাধ্যম নিলেন ৫টি।

আহমদ বিন ইশকাব,
তারপর মুহাম্মদ বিন ফুযাইল,
তারপর আম্মারাহ বিন কা’কা’
তারপর আবু জুরআ,
তারপর আবু হুরায়রা রাঃ।

তাহলে ইমাম বুখারী রহঃ আমাদের মদীনায় পৌঁছাতে মাধ্যম বানালেন ৫টি।

এবার লক্ষ্য করুন ইমাম আবু হানীফা রহঃ আমাদের মদীনায় পৌঁছাতে কয়টি মাধ্যম ব্যবহার করেন-

عن ابى حنيفة عن عبد الله بن انيس قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم
عن ابى حنيفة عن عبد الله بن ابى اوفى قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم
عن ابى حنيفة عن عبد الله بن حارث قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم
عن ابى حنيفة عن جابر بن عبد الله قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم

ইমাম বুখারী যেখানে আমাদের মদীনায় পৌছাতে ব্যবহার করেন ৫টি মাধ্যম। আর ইমাম আবু হানীফা রহঃ ব্যবহার করেন মাত্র একটি মাধ্যম।

তিনি বর্ণনা করেন সরাসরি

হযরত আব্দুল্লাহ বিন উনাইস রাঃ থেকে।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন আবী আওফা রাঃ থেকে।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন হারেস রাঃ থেকে।
হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ রাঃ থেকে।

যেহেতু আমরা মদীনার ইলমে পৌঁছতে চাই। আর সেখানে পৌছতে ইমাম বুখারীর মাধ্যম বেশি আর ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর মাধ্যম কম। তাই আমরা আবু বুখারী রহঃ কে রেখে ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর তাক্বলীদ করে দ্রুত মদীনার ইলমের শহরে পৌঁছে যাই।

৭।

ইমাম বুখারী রহঃ থেকে তার কিতাব ৯০ হাজার ছাত্ররা পড়েছেন। কিন্তু বুখারী শরীফের সনদ প্রসিদ্ধ চারজনের মাধ্যমে। যথা-

১-ইবরাহীম বিন মা’কাল বিন হাজ্জাজ আন নাসাফী রহঃ। তিনি ২৯৪ হিজরীতে ইন্তেকাল করেছেন।

২- হাম্মাদ বিন শাকের আন নাসাফী রহঃ। যিনি ৩১১ হিজরীতে ইন্তেকাল করেছেন।

৩-মুহাম্মদ বিন ইউসুফ আল ফিরাবরী রহঃ। তিনি ৩২০ হিজরীতে ইন্তেকাল করেছেন।

৪-আবু তালহা মানসুর বিন মুহাম্মদ রহঃ। তিনি ২৬৯ হিজরীতে ইন্তেকাল করেছেন।

লক্ষ্য করুন-৯০ হাজার ছাত্রদের মাঝে যে চারজনের সনদ প্রসিদ্ধ বুখারীর।

এর মাঝে প্রথম দুইজন তথা ইবরাহীম বিন মা’কাল বিন হাজ্জাজ আন নাসাফী রহঃ এবং হাম্মাদ বিন শাকের আন নাসাফী রহঃ ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর মুকাল্লিদ।

তাহলে কি বুঝা গেল? ইমাম বুখারী রহঃ যাদের কাছে পড়েছেন তারাও হানাফী। যে শহরে বেশি গেছেন সেটাও হানাফী। যাদের মাধ্যমে বুখারী প্রচারিত হয়েছে তারাও হানাফী।

Source: http://www.somewhereinblog.net

Thursday, June 13, 2013

ইমাম আবু হানীফা (রহ.) তাবেয়ী ছিলেন।

ইমাম আবু হানীফা (রহ.) তাবেয়ী ছিলেন।
লিখেছেন: ' দ্য মুসলিম' 


এই উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম ছিলেন সাহাবায়ে-কেরাম। সাহাবীদের পরবর্তী মর্তবা হচ্ছে তাবেয়ীগণের। সর্বসম্মতভাবে সাহাবীর সংজ্ঞা হলোঃ যাঁরা ঈমানের সাথে হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন এবং ঈমান নিয়েই মৃত্যুবরণ করেছেন। আর তাবেয়ী হচ্ছেন, যাঁরা ঈমানের সাথে সাহবীগণের সাক্ষাত লাভ করেছেন এবং ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করেছেন। (নাখবাতুল-ফেকার)
সাহাবী এবং তবেয়ীগণের মর্যাদা নির্দেশ করে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- ঈমান আনার ব্যাপারে অগ্রবর্তিগণ, মুহাজের ও আনসারবৃন্দ এবং তাদের সৎকর্মের যারা অনুসরণ করেছেন তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করেছেন এবং তাঁরাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন।
হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, অত্যন্ত সৌভাগ্রবান সেই সমস্ত লোক যারা আমার সাক্ষাত লাভ করেছে এবং আমার সাক্ষাত যারা পেয়েছে, তাদেরকে পেয়েছে।
হযরত ইমরান ইবেন হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়া’লা আনহু থেকে বর্ণিত, হুজুর স. ইরশাদ করেন, “আমার উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম (যুগ) হলো আমার  (সাহাবীগণের) যুগ। অত:পর তৎপরবর্তী (তাবিঈনদের) যুগ। অত:পর তৎপরবর্তী (তাবি’তাবঈন) যুগ।”- বুখারী শরীফ (১/ ৩৬২ ও ৫১৫ পৃষ্ঠা), বুখারী শরীফ (২/ ৯৫১ পৃষ্ঠা), মুসলিম শরীফ (৩০৯ পৃষ্ঠা), আবু দাউদ শরীফ (২৯২ পৃষ্ঠা), তিরমিযী শরীফ (৪৫,৫৪ ও ২২৬ পৃষ্ঠা), ইবনে মাজাহ শরীফ (১৭২ পৃষ্ঠা)।
 ইমাম আবু হানীফার রহ. জন্ম ৮০ হিজরী সনে। সর্বাপেক্ষা বয়স্ক সাহাবী হযরত আবু তোফায়েল রা. ইন্তেকাল করেছেন ১১০ হিজরীতে। আবু হানীফার জন্মকাল থেকে নিয়ে একশত দশ হিজরী এই দীর্ঘ ত্রিশ বছর সময়কালের মধ্যে শতাধিক সাহাবী জীবিত ছিলেন। হাফেযুল হাদিস ইমাম মুযনীর রহ. বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম আবু হানীফা রহ. অন্যুন ৭২জন সাহাবীর সাক্ষাত লাভ করেছিলেন। (মুজামুল মুসান্নেফীন)
হাফেজ ইবনে হাজার আসক্বালানী রহ. বলেন, তাবেয়ী হওয়ার জন্য সাহাবীগণের সাক্ষাত লাভই যথেষ্ট। কেননা, হাদীস শরীফে শুধুমাত্র দেখা’র কথা বলা হয়েছে। সে মতে যারা তাবেয়ী হওয়ার জন্য দীর্ঘ সাহচর্য এবং সাহাবীগণের নিকট থেকে হাদিস বর্ণনা করাকেও শর্ত নির্ধারণ করেন তাদের বক্তব্য সঠিক নয়। (নুযহাতুননযর)
শায়খ আবুল হাসান হাফেজ ইবনে হাজারের উপরোক্ত বক্তব্যের ব্যাখ্যা করে বলেন- আল্লামা এরাক্বীর অভিমত অনুযায়ী এটাই অধিকসংখ্যক আলেমের অভিমত এবং এটাই সর্বাধীক গ্রহণযোগ্য তথ্য। কেননা, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বক্তব্য থেকে তাই প্রমাণিত হয়। সুতরাং হাদীসের বক্তব্য অনুযায়ী ইমাম আবু হানীফা রহ. সন্দেহাতীত ভাবে তাবেয়ীগণের অন্তর্ভুক্ত বলে প্রমাণিত হল। কেননা, তিনি আনাস ইবনে মালেক রা. এবং অন্য আরো কয়েকজন সাহাবীকে দেখেছেন। যেসব লোক ইমাম আবু হানীফকে রহ. তাবেয়ীদের মর্যাদা দিতে চান না, এরা নির্বোধ এবং বিদ্বষপরায়ন। (প্রাগুক্ত)
হাফেজ ইবনে হাজার আসক্বালানী রহ. আরো লিখেছেন- ইমাম আবু হানীফা রহ. বহুসংখ্যক সাহাবীর সাক্ষাত লাভ করেছেন। কেননা, তিনি ৮০ হিজরী সনে কুফায় জন্মগ্রহণ করেছেন এবং সেসময় সেই শহরে সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আবী আওফা রা. জীবিত ছিলেন। তাঁর ইন্তেকাল ৮০ হিজরীর অনেক পরে হয়েছে। তেমনি বসরাতে আনাস ইবনে মালেক রা. ছিলেন। তাঁর ইন্তেকাল হিজরী নব্বই সনে পরে হয়েছে। সে মতে ইমাম আবু হানীফা রহ. নিঃসন্দেহে তাবেয়ীগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। (তানসীকুন-নেজাম)
বুখারী শরীফের ব্যাখাগ্রন্হে ইবনে হাজার আসক্বালানী রহ. উপরোক্ত সিদ্ধান্তটি আলেমগণের সর্বসম্মত অভিমত বলে উল্লেখ করেছেন। হাফেজ যাহাবী রহ. বলেন, ইমাম আবু হানীফা রহ. সাহাবী হযরত আনাস ইবনে মালেককে রা. অনেকবার দেখেছেন। (খাইরাতুল-হেসান)
আল্লামা ইবনে হাজার মক্কী রহ. মেশকাত শরীফের ব্যাখ্যা গন্হে উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম আবু হানীফা রহ. অন্যুন আটজন সাহাবীর সাক্ষাত লাভ করেছেন।
এঁরা হচ্ছেন-
১) হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. (ওফাত ৯৩ হিজরী)
২) আব্দুল্লাহ ইবনে আবী আওফা রা. (ওফাত ৮৭ হিজরী)
৩) সহল ইবনে সাআদ রা. (ওফাত ৮৮ হিজরী)
৪) আবু তোফায়ল রা. (ওফাত ১১০ হিজরী)
৫) আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়দী রা. (ওফাত ৯৯ হিজরী)
৬) জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. (ওফাত ৯৪ হিজরী)
৭) ওয়াসেনা ইবনুল আসকা রা. (ওফাত ৮৫ হিজরী)
ইবনে সাআদ লিখেছেন- সার্বিক বিচারেই ইমাম আবু হানীফা রহ. একজন তাবেয়ী ছিলেন। তাঁর সতীর্থ ফেকাহর ইমামগণের মধ্যে আর কারো এই মর্যাদা লাভের সৌভাগ্য হয় নাই। (তানসীক্ব)
আল্লামা খাওয়ারেজমী রহ. বলেন- ওলামাগণের এ বিষয়ে ঐক্যমত রয়েছে যে, ইমাম আবু হানীফা রহ. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণের পবিত্র মুখ থেকে হাদিস শ্রবণ করে তা বর্ণনা করেছেন। তবে এরূপ হাদিসের সংখ্যা কত ছিল, এ সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে। (তানসীক্ব)
ইমাম আবু হানীফা রহ. কর্তৃক সাহাবীগণ থেকে বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা কারো মতে ছয়, কারো মতে সাত এবং কারো মতে আটখানা। যেসব সাহাবী থেকে ইমাম সাহেব হাদিস বর্ণনা করেছিলেন, তাঁদের নাম যথাক্রমে – আনাস ইবনে মালেক রা., আবদুল্লাহ ইবনে আবী আওফা রা., সহল আবনে সাআদ রা., আবু তোফয়ল রা., আমের ইবনে ওয়াছেলা রা., ওয়াছেলা ইবনে আশক্বা রা., মা’কাল ইবনে ইয়াসার রা., এবং জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. প্রমুখগণ।
হাদিস শাস্ত্রের ‘ আমিরুল মুমেনীন’ রূপে খ্যাত আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক স্বরচিত কবিতার এক পংক্তিতে উল্লেখ করেছেন যে, নোমান ( আবু হানীফা ) এর পক্ষে গর্ব করার মতো এতটুকুই যথেষ্ট যা তিনি সরাসরি সাহাবীগণের নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন।
ইমাম আবু হানীফা রহ. স্বয়ং একটি বর্ণনায় বলেন, আমার জন্ম হিজরী ৮০ সনে এবং ৯৬ সনে প্রথম হজে যাই। তখন আমার বয়স ষোল বছর। মসজিদুল-হারামে প্রবেশ করে দেখলাম, একটি বড় হালকায় বহু লোক সমবেত হয়ে রয়েছেন। আমি আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কিসের জমায়েত? তিনি বললেন, এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনুল হারেছের রা. পাঠদানের হালকা। এ কথা শুনে আমি সেদিকে অগ্রসর হলাম। তাঁকে বলতে শুনলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর দীন সম্পর্কিত গভীর জ্ঞান অর্জনে আত্মনিয়োগ করে, তার সকল প্রয়োজনের জিম্মাদার স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা হয়ে যান এবঙ তাকে এমন সব উৎস থেকে রিজিক পৌছাতে থাকেন, যা সে কখনো কল্পনাও করেনি। (মুসনাদে ইমাম আযম)
উল্লেখ্য যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হারেছের রা. ইন্তেকাল হয়েছে ৯৯ হিজরীতে। তখন ইমাম সাহেবের বয়স হয়েছিলো ১৯ বছর।
‘এলামুল-আখবার’ নামক গ্রন্হে বর্ণিত অন্য একখানা হাদিস ইমাম আবু হানীফা রহ. সরাসরি সাহাবী হযরত আনাস ইবনে মালেকের রা. নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন। উক্ত হাদিসে বলা হয়েছে যে, এলেম শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উপর ফরজ।
একই সুত্রে হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে ইমাম আবু হানীফা রহ. কর্তৃক বর্ণিত অন্য আর একখানা হাদিস হচ্ছে- পাখীরা আল্লাহর উপর যতটুকু ভরসা করে জীবন ধারন করে কোন বান্দা যদি ততটুকু ভরসা করতে শেখে তবে আল্লাহ পাক তাকেও অনুরূপ রিজিক দান করবেন। পাখীরা সকাল বেলায় খালি পেটে বের হয়ে যায়, সন্ধায় পেট ভরে বাসায় ফিরে আসে।
ইমাম সাহেব আর একখানা হাদিস সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবী আওফা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। হাদিস খানা হচ্ছে- যে ব্যক্তি মসজিদ নির্মাণ করবে আল্লাহ পাক তার জন্য বেহেশতে গৃহ নির্মাণ করবেন।
শেষোক্ত হাদিসখানাকে ইমাম জালালুদ্দিন সিয়ুতী রহ. মোতাওয়াতের হাদিস রূপে অভিহিত করেছেন।
মোল্লা আলী কারী রহ. বরেন, এই হাদিসটির অন্যুন পঞ্চাশটি সনদ আমি সংগ্রহ করেছি। তম্মধ্যে ইমাম আবু হানীফার রহ. মাধ্যমে বর্ণিত সনদিই সর্বোত্তম। 

কয়েক বছর আগে ড. মুহাম্মাদ আবদুশ শহীদ নোমানী দা. বা. ( প্রফেসর শবায়ে আরাবী , করাচী ইউনিভার্সিটি ) এর রচিত " ইমাম আবু হানিফা কি তাবেয়্যিআত আওর সাহাবা সে উনকি রেওয়ায়েত " ( ইমাম আবু হানিফা র. এর তাবেয়ী হওয়া ও সাহাবা থেকে তাঁর হাদিস বর্ণনা) মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়েছে।
ভূমিকাতে তিনি নিজেই লিখেছেন, " ..ইদানিং কিছু ব্যক্তিকে দু:খজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, ইমাম আবু হানিফা (র) সম্পর্কে অনেক মিথ্যা অপপ্রচার চালাতে....পাঠককে আমি আশ্বস্ত করছি আমি হানাফী মাযহাবের অনুসারী নই...!!"
এছাড়া ইমাম সাহেব বিপুল সংখ্যক তাবেয়ী মনীষীদের সাহচর্য পেয়েছেন। তাঁরা ছিলেন অসংখ্য সাহাবী ও তাঁদের সমসাময়িক প্রবীন তাবেয়ীদের সহচর্যে ধন্য। এজন্যে 'আমলে মুতাওরাস' অর্থাৎ কর্মগত ধারায় চলে আসা নবী সা. এর আমলকে যতটা কাছ থেকে দেখার সূযোগ পেয়েছেন, ততটা হাদিস ও ফিকাহর অন্যান্য ইমামের হয়নি। কেননা তাঁরা সবাই তাঁর পরের যুগের ছিলেন।

সুত্রঃ মাসিক মদিনা, জানুয়ারী ২০১০

ইমাম আবু হানিফা রঃ এর শাহাদাত বরনের ইতিহাস

ইমাম আবু হানিফা রঃ এর শাহাদাত বরনের ইতিহাস

 - এম আবদুল্লাহ ভূঁইয়া 

 

ইমাম আবু হানিফা চার প্রসিদ্ধ ইমামের মাঝে বড় ইমাম হিসাবে পরিচিত। পাক-ভারত উপমহাদেশে তাঁর মাযহাবের অনুসারীর সংখ্যাই বেশী। খলীফা মানসুরের সময় ইমাম আবু হানিফাকে প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহনের জন্য আহবান জানানো হয়। তিনি উক্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে খলীফাকে সম্বোধন করে বলেন, ’’ আল্লাহর শপথ, কোন ব্যাপারে আমার ফয়সালা যদি আপনার বিরুদ্ধে যায় এবং আপনি আমাকে হুকুম দেন যে হয়ত সিদ্বান্ত পাল্টাও না হলে তোমাকে ফোরাত নদীদে ডুবিয়ে মারা হবে। তখন আমি ডুবে মরতে প্রস্তুত থাকব তবু সিদ্ধান্ত পাল্টাতে পারবনা। তা ছাড়া আপনার দরবারে এমন অনেক লোক রয়েছে যাদের মনোতুষ্টি করার মত কাজীর প্রয়োজন।’’


ইমাম আবু হানিফা খলীফার প্রস্তাব প্রত্যখ্যান করার পর তাকে ত্রিশটি বেত্রাঘাত করা হয়। যার ফলে তাঁর সারা শরীর রক্তাক্ত হয়ে পড়ে। তখন খলীফা মানসুরের চাচা আব্দুস সামাদ ইবনে আলী তাকে এজন্য খুবই তিরষ্কার করে বলেন- “ইনি শুধু ইরাকের ফকীহ নন, সমগ্র প্রাচ্যবাসীর ফকীহ।’’ এতে মনসুর লজ্জিত হয়ে প্রত্যেক চাবুঘাতের বদলে এক হাজার দিরহাম ইমাম আবু হানিফার কাছে পাঠান।

ইমাম আবু হানিফা উক্ত দিরহাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। তখন তাকে বলা হয় তিনি এ অর্থ গ্রহণ করে নিজের জন্য না রাখলেও দুঃখী-গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দেন। এর জবাবে ইমাম বলেন- "তোমার কাছে কি কোন হালাল অর্থ রয়েছে ?

মানসুর এতে আরও প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠে। ইমামকে আরও চাবুকাঘাত করার আদেশ দেন। কারারুদ্ধ করে পানাহারে নানাভাবে কষ্ট দেয়া হয়। তারপর একটা বাড়ীতে নজরবন্দী করে রাখা হয়। সেখানেই ইমাম আবু হানিফার মৃত্যূ হয়। কারো কারো মতে তাঁকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। নির্মম নির্যাতনের শিকার ইমাম আবু হানিফা মৃত্যুর আগে অসিয়ত করে যান যে, খলীফা মানসুর জনগনের অর্থ অন্যায়ভাবে দখল করে বাগদাদের যেই এলাকায় শহর নির্মাণ করেছে সে এলাকায় যেন তাঁকে দাফন করা না হয়। মূলত খলীফা মানসুর তার ক্ষমতার স্বার্থেই ইমাম আবু হানিফাকে বিচারকের পদে নিয়োগ দিতে চেয়েছিলেন। তাই ইমাম তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ইমাম আবু হানিফা এই বিষয়টি স্পষ্ট করেই খলীফা মানসুরকে জানিয়ে দিয়ে বলেন- “আপনি আমাদেরকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ডেকে আনেননি। বরং আপনি চান যে আপনার ভয়ে যেন আমরা আপনার মর্জি মাফিক কথা বলি’’।

বর্তমান যামানায় ইমাম আবু হানিফা সর্বজন সমাদৃত। আজকে যে সকল মুসলিম শাসকগণ, ইমাম ও ইসলামী চিন্তাবিদদের উপর নির্যাতন করছেন কিংবা কারাবন্ধী করছেন তাদের অনেকেই ইমাম আবু হানিফার মাযহাব অনুসারী বলে দাবী করেন। কিন্তু ইতিহাস এই সত্যেরই সাক্ষী যে, সারা জাহানে ইমাম আবু হানিফার মর্যাদা এবং তৎকালীন জালিম শাসকদের মর্যাদায় আকাশ পাতাল পার্থক্য রয়েছে।

তথ্যসুত্র: ইসলামী চিন্তাবিদদের উপর নির্যাতন যুগে যুগে-১ 

 

ইন্তিকাল ও সমাধীস্হল :—

ইমাম আবু হানিফা হিজরী ১৫০ সন মুতাবিক ৭৬৭ খ্রিঃ খলিফা মনসুর কর্তৃক প্রয়োগকৃত বিষক্রিয়ার ফলে কারাগারে ইন্তিকাল করেন। ।তাঁর প্রথম জানাজায় লোকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৫০ হাজারেরও উপরে।৫/৬ দফায় তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় ৷ নির্মম নির্যাতনের শিকার ইমাম আবু হানিফা মৃত্যুর আগে অসিয়ত করে যান যে খলীফা মানুসর জনগনের অর্থ অন্যায়ভাবে দখল করে বাগদাদের যেই এলাকায় শহর নির্মান করেছে সে এলাকায় যেন এন্তেকালের পর তাঁকে দাফন করা না হয়। তার জানাজায় সর্বশেষ ইমামতি করেন তার পুত্র হাম্মাদ। তাকে খাজরান নামক স্থানে  সমাহিত করা হয়।

দাফনের পরও বিশ দিন পর্যন্ত তাঁর কবরের পাশে জানাজার নামাজ আদায় করা হয়।তার জন্য লোকজন মৃত্যুর ২০ দিন পর্যন্ত প্রার্থনা করেছিল। পরবর্তীতে, অনেক বছর পর বাগদাদের পাশে আধামিয়াতে আবু হানিফ মসজিদ নামে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হয় আবু হানিফার নামে।

 

Wednesday, June 12, 2013

হানাফি মাযহাবের শ্রেষ্ঠত্বে ইমাম-ই আ’যম আবূ হানিফা (রা:)

হানাফি মাযহাবের শ্রেষ্ঠত্বে ইমাম-ই আ’যম আবূ হানিফা (রা:)

 মুহাম্মদ মোবারক হোসাইন

ইমাম আ’যম (রা:) এর শুভ জন্ম, নাম-উপনাম :-
আবু হানিফা নোমান ইবনে ছাবিত যওজী। ইমাম চতুষ্টয়ের মধ্যে অগ্রজ। মুসলিম সমাজে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা সর্বাধিক। জন্মকাল নিয়ে তিনটি মত আছে ১. ৬৩ হিজরী ২. ৭০ হিজরী ৩. ৮০ হিজরী। তৃতীয় মতটিই প্রসিদ্ধ। কেননা ইমাম আ’যম (রা:) এর পৌত্র ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ বলেন, “আমার দাদা ৮০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন”।১ বাগদাদে ১৫০ হিজরীতে ওফাত। উপাধী ইমামে আ’যম। তাঁর নামের শাব্দিক অর্থ পর্যালোচনায় দেখা যাবে তাঁর নামে ও কাজে পুরোপুরি মিল। আল্লামা ইবনে হাজার হায়তামী (রহ:) বলেন অর্থাৎ সকল ইমাম ঐক্যমত পোষণ করেন যে, তাঁর নাম নো’মান। এতে এক গূঢ় রহস্য রয়েছে ১. নো’মান এমন রক্ত, যা দ্বারা শরীরের কাঠামো প্রতিষ্ঠিত থাকে। ২. কেউ কেউ বলেন, নো’মানের অর্থ রুহ। ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এর মাধ্যমে ফিক্‌হে ইসলামীর কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ফিকহ শাস্ত্রের দলীলাদি ও বিভিন্ন দুরুহ বিষয়ের সমাধানের মূল। ৩. নু’মান অর্থ লাল সুগন্ধিযুক্ত ঘাস বা বেগুনি রঙের নাম। সে হিসেবে ইমাম আবূ হানিফার (রা:) অভ্যাস ভাল এবং তাঁর গুণাবলি পূর্ণতার শীর্ষে পৌছেছে। ৪. নু’মান শব্দটি “ফু’লান” শব্দের ওযনে “নি’মাত” শব্দ থেকে নির্গত হয়েছে। তখন অর্থ হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইমাম আ’যম মানুষের উপর এক বড় নিয়ামত।২
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পারস্যবাসীর এক ভাগ্যবান ব্যক্তির সুসংবাদ দিয়েছেন। সে হাদীসকে ইমাম মুসলিম (রহ:) হযরত আবূ হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণনা করেছেন। সরওয়ারে কায়েনাত হুজুর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
لو كان الدين عند الثريا لناله رجل من فارس او قال من ابناء فارس حتى يتناوله-
-যদি দ্বীন সপ্তর্ষিমণ্ডলস্থ সুরাইয়া সেতারার কাছে গচ্ছিত থাকে তখনও পারস্যবাসীর এক ব্যাক্তি তা অর্জন করে নেবে।৩
মুহাদ্দিসগণ বলেছেন এ হাদীসটি ইমাম আ’যম আবূ হানিফা (রা:) এর উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। এতে কোনো আলেম দ্বিমত পোষণ করেননি।
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী শাফেয়ী (রহ:) “তাবয়িযূস সহিফা” কিতাবে এবং ইমাম ইবনে হাজার মক্কী (রহ:) “আল খায়রাতুল হিসান” এর মধ্যে “ইমাম আ’যম আবূ হানিফার (রা:) এর ব্যাপারে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুসংবাদ” শিরোণামে অধ্যায় রচনা করেছেন।
শৈশবকাল ও শিক্ষা জীবন :-
শৈশব কেটেছে বসরার কূফা নগরিতে। তৎকালিন ইসলামী নগর হিসেবে কূফা খ্যাতি কুঁড়িয়েছিল।
্থ ফাজিল স্নতক শেষ বর্ষ ফলপ্রার্থী, কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদরাসা।
এখানে বড় বড় আলেমের মজলিশ বসত। ইমাম আবূ হানিফা (রা:) প্রাথমিক ও প্রয়োজনীয় দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করার পর ব্যবসার দিকে মনোনিবেশ করলেন। একদিন তিনি ব্যবসার কাজে বাজারে যাচ্ছিলেন। রাস্তায় ইমাম শা’বি (রা:) এর সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়। তিনি তাঁর চেহারায় অসাধারণ মেধা ও সৌভাগ্যের চিহ্ন দেখতে পান। তিনি তাঁকে ডাকলেন আর বললেন, “কোথায় যাচ্ছ?” ইমাম বললেন, “আমি বাজারে যাচ্ছি।” তিনি বললেন, “আলিমদের মজলিসে বস কারণ, আমি তোমার চেহারায় জ্ঞান ও গুণের চিহ্নাদির উজ্জ্বলতা দেখতে পাচ্ছি।”৪
এরপর ইমাম আ’যম (রা:) এর মনে শিক্ষার্জনের আগ্রহ সৃষ্টি হল। প্রথমে তিনি ‘ইলমে কালাম’ শিখতে আরম্ভ করলেন। এতে দক্ষতা অর্জন করে গোমরা ফির্কাগুলো- যেমন জাহমিয়া ও ক্বদরিয়া ফির্কার লোকদের সাথে তর্ক-মোনাযারা আরম্ভ করে দিলেন। এভাবে কিছুদিন এসব বাতিল ফির্কার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকেন এবং তাদের ভ্রান্তিগুলোকে লোকসমক্ষে আরো স্পষ্ট করে দিলেন।
পরবর্তীতে ফিকহ্‌ চর্চায় মনোনিবেশ করেন। হযরত হাম্মাদ (রা:) ছিলেন তৎকালীন একজন ফিকহ শাস্ত্রের গুরু, তিনি তাঁর মজলিশে প্রবেশ করেন। হযরত হাম্মাদ (রা:) ছিলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা:) এর মূলধারার শিষ্য। হযরত হাম্মাদ (রা:) জ্ঞান আহরণ করেছেন হযরত ইব্রাহীম নখয়ী (রা:) থেকে। যিনি ছিলেন হযরত আলকামা (রা:) এর যোগ্য উত্তরসূরী। হযরত হাম্মাদ (রা:) এর দরসে তিনি বিশেষ স্থান পেয়ে যান এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে ওস্তাদের চোখের মণি হয়ে যান। কিছুদিনের মধ্যে তিনি ওস্তাদের মর্যাদায় উন্নীত হন। ইত্যবসরে তিনি আলাদা দরসের মজলিস কায়েম করার মনস্থ করলেন। হযরত হাম্মাদ (রা:) কিছুদিনের জন্য কোথাও যাবেন তখন তিনি ইমাম আ’যম (রা:) কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে যান। তাঁর অনুপস্থিতিতে ইমাম আ’যম ৬০টা ফতওয়া জারি করেন। পরবর্তীতে হযরত হাম্মাদ (রা:) এর নিকট ফতওয়াগুলো পেশ করা হলে ৪০টি ফতওয়ার সাথে তিনি ঐক্যমত পোষণ করলেন। আর বাকি ২০টি মাসআলায় মুজতাহিদসূলভ বিরোধিতা করলেন। তখন ইমাম আ’যম শপথ করে নিলেন, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি হযরত হাম্মাদ (রা:) এর দরসের মজলিস ছাড়বেন না। তিনি তা পূর্ণও করেছিলেন।৫
১২০ হিজরীতে হযরত হাম্মাদ (রা:) ইন্তেকাল করলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এর নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বেই কূফার বিদ্যাপীঠ পরিচালিত হতে থাকে। যাকে তৎকালীন ফোকাহায়ে কেরাম “কিয়াসের প্রতিষ্ঠান” হিসেবে চিহ্নিত করেন। যুগশ্রেষ্ঠ আলেমগণ সেখানে হাজির হতে থাকেন। বসরা, মক্কা ও মদিনার আলেমগণও এ থেকে বাদ যাননি। আব্বাসীয় খলিফা আল মানসূর ক্ষমতায় এলে তাঁর এ বিদ্যাপিঠ বাগদাদে স্থানান্তরিত হয়। ওলামায়ে কেরাম তাঁর সাথে তর্ক-বিতর্ক ও গবেষণা করেন। তারা ইমাম আবূ হানিফা (রা:) থেকে জ্ঞান-পিপাসা নিবারণ করেন।
শিক্ষকবৃন্দ :-
আমাদের সমাজে লা-মাযহাবিরা বলে যে, ইমাম আ’যম আবূ হানিফা (রা:) মুহাদ্দিস ছিলেন না। অথচ তাঁর হাদিস শাস্ত্রে উস্তাদগণ ছিলেন প্রায় চার হাজার।
১. ইমাম আবূ আবদুল্লাহ ইবনে আবূ হাফস কবির ইমাম আবূ হানিফা ও ইমাম শাফেয়ীর শিষ্যদের মধ্যকার একটি তর্ক তুলে ধরে লিখেছেন, -(এক সময়) ইমাম শাফেয়ীর শিষ্যগণ ইমাম শাফেয়ীকে ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এর উপর মর্যাদা দিচ্ছিলেন, আবূ আবদুল্লাহ ইবনে আবূ হাফস হানাফী শাফেয়ীগণকে বলেন, “তোমরা ইমাম শাফেয়ীর শিক্ষকগণের গণনা করে বল তাদের সংখ্যা কত”? তাঁরা তখন গণনা করে বললেন, “আশিজন”। তখন হানাফিরা ইমাম আবূ হানিফার ওলামা ও তাবে’ঈ-শিক্ষক গণনা করলেন, তাঁদের সংখ্যা বের হল “চার হাজার”। তখন আবূ আবদুল্লাহ বলেন, “এটা ইমাম শাফেয়ীসহ অন্যান্য ইমামদের উপর ইমাম আবূ হানিফার সামান্য মর্যাদা”।৬
২. ইমাম ইবনে হাজার মক্কী (রহ:) ইমাম আ’যমের মাশায়েখের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এর অনেক শিক্ষক ছিলেন। ইমাম আবূ হাফস তাঁদের থেকে চার হাজার মাশায়েখের গণনা করেছেন। কেউ বলেন, শুধুমাত্র তাঁর তাবে’ঈ মাশায়েখের সংখ্যা চার হাজার।৭
ছাত্রবৃন্দ :-
ইমাম আ’যমের ছাত্রদের সংখ্যাও গণনার বাইরে। ইমাম আবূ ইয়ূসুফ, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে শায়বাহ্‌ এবং ইমাম যোফর হলেন তাঁর ওই শত গর্বের উপযোগী শাগরিদ, যাঁরা সমগ্র দুনিয়ায় হানাফী ফিক্বহ্‌কে প্রসারিত করেছেন। আর ইমাম আ’যমের শিক্ষাকে এভাবে প্রচার করেছেন যে, আজ বিশ্বে দুই’তৃতীয়াংশেরও বেশি মুসলমান হানাফী ফিক্বহ অনুসারে তাঁদের ইবাদত-বন্দেগী ও পার্থিব কার্যাদি সম্পন্ন করছেন। তা’ছাড়াও হাম্মাদ ইবনে নু’মান, ইবরাহিম ইবনে ত্বাহমান, হামযাহ ইবনে হাবিব, আবূ ইয়াহয়া হাম্মানী, আবূ নু’আইম ও আবূ আসেমের মত যুগবরেণ্য ফিক্বহবিদগণও ইমাম আ’যমের বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছাত্র ছিলেন।৮
আদর্শ চরিত্র :-
ইমাম আ’যম শুধু জ্ঞানে অদ্বিতীয় ছিলেন না, তিনি সুন্দর চরিত্রের দিক দিয়েও অনন্য ছিলেন। তাঁর নির্ভুল চিন্তাধারা ও জ্ঞানের প্রশস্ততা যেভাবে ক্বিয়ামত পর্যন্ত মানুষের একটি কর্মসূচি সরবরাহ করেছে, অনুরূপ তারঁ উন্নত এবং আর্দশ চরিত্রও মানুষের কর্মপদ্ধতিকে মহত্বের উপাদান দান করেছে। তাঁর আদর্শ চরিত্রের বিবরণ দিতে গিয়ে বড় বড় গ্রন্থ ও ইতিহাস রচিত হয়েছে। এ ক্ষুদ্র পরিসরে একটি মাত্র ঘটনা অবতারণা করার প্রয়াস পাচ্ছি। ইমাম যা’ফরানী লিখেছেন, একদা বাদশাহ্‌ হারূনুর রশীদ ইমাম আবূ ইয়ুসুফকে বললেন, “ইমাম আবূ হানিফার কিছু গুণ বর্ণনা করুন”। তিনি বললেন, “ইমাম আ’যম হারাম কার্যাদি থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতেন। জ্ঞানবিহীন দ্বীনি বিষয়ে কোন কথা বলতে খুবই ভয় করতেন। তিনি আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদতে চূড়ান্ত পযাের্য়র চেষ্টা করতেন। দুনিয়াবাসীদের সামনে কখনো তাদের প্রশংসা করতেন না। বেশির ভাগ সময় নিশ্চুপ থাকতেন। দ্বীনি মাসাইলের সমাধান নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতেন। এত বড় জ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত সাদাসিধে ও বিনয়ী ছিলেন। যখন তাঁকে কোন বিষয়ে প্রশ্ন করা হত, তখন তিনি কিতাব ও সুন্নাহ’র দিকে প্রত্যাবর্তন করতেন। যদি সেটার উদাহরণ ক্বোরআন ও হাদীসে না পেতেন, তাহলে ক্বিয়াস (অনুমান) করতেন। কারো নিকট থেকে কিছু পাওয়ার অভিলাষ তাঁর ছিল না। কারো সম্পর্কে আলোচনা করলে তার সদগুণাবলী নিয়েই আলোচনা করতেন।” এসব শুনে বাদশাহ্‌ হারূনুর রশীদ বললেন, “নেক্কার বুযুর্গদের চরিত্র এমনি হয়ে থাকে।” অতঃপর তিনি কেরানীকে বললেন “এ গুণগুলো লিখে নাও,” আর পুত্রকে বললেন, “এসব গুণাবলী মুখস্থ করে নাও।”৯
ইবাদত ও সাধনা :-
ইমাম আযম আবূ হানিফা (রা:) দীর্ঘ ৪০ বছর যাবৎ এশার নামাযের ওযূ দিয়ে ফজরের নামায সম্পন্ন করেছেন। ইমাম আবূ ইয়ূসুফ (রহ:) বলেছেন, ইমাম আযম (রা:) সারারাত জেগে ইবাদত করার বাহ্যিক কারণ এ ছিল যে, একদা এক ব্যক্তি তাঁকে দেখে বলল, “ইনি ওই ব্যক্তি, যিনি সারারাত ইবাদতের মধ্যে অতিবাহিত করেন”। ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এ কথা শুনে বলতে লাগলেন, “আমাকে মানুষের ধারণানূসারে গঠন করতে হবে”। এরপর থেকে তিনি সারারাত জেগে ইবাদত করতে লাগলেন। দীর্ঘ চল্লিশ বছর যাবৎ তাঁর এ নিয়ম অব্যাহত ছিল।১০
ইমাম আ’যমের (রা:)-এর ব্যাপারে অপপ্রচার :-
লা-মাযহাবি/আহলে হাদিস সম্প্রদায় ইমাম আ’যম (রা:) এর ব্যাপারে বিভিন্ন ধরণের অপপ্রচার চালাচ্ছে। তারা বলে- “আবূ হানিফা হাদিস জানতেন না। তিনি সহিহ হাদিস বাদ দিয়ে দুর্বল হাদিস বর্ণনা করতেন।” সেই কারণে তারা ইমাম আবূ হানিফা (রা:)-এর মাযহাব বাদ দিয়ে হাদিসের উপর আমল করতে শুরু করেছে। এবং তাদের মাযহাবের নাম দিয়েছে “লা-মাযহাবী”। বাংলা বুখারী পড়ে ওখানে তারা হাদিস পেয়েছে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম رفع اليدين করতেন, তাদের কথা “বুখারী শরীফে পাঁচটি হাদিস আছে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম رفع اليدين করেছেন এখন কার কথা মানব নবীজির কথা না ইমাম আবূ হানিফার কথা”। এ নিয়ে তারা কোঁমড় বেঁধে মাঠে নেমেছে। অথচ তারা যে বোকার স্বর্গে বাস করছে তার সামান্যতম খবরও তাদের নেই। বুখারী শরীফের মধ্যে আমরা যে পাঁচটি হাদীস দেখতে পাই যে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম رفع اليدين করেছেন, সেই বূখারী শরীফের হাদিসগুলোর পাশেই হাশীয়ায় স্পষ্ট ভাষায় লেখা–
واجابوا عن حديث الباب ونحوه بانه محمول على انه كان فى ابتداء الاسلام ثم نسخ والدليل عليه ان عبدالله بن الزبير رضى الله عنه راى رجلا يرفع يديه فى الصلوة عند الركوع وعند رفع رأسه من الركوع فقال لا تفعل بذاشئ فعله رسول الله صلى الله عليه وسلم ثم تركه ويويد النسخ ما رواه الطحاوى باسند صحيح حدثنا ابن ابى داود قال انا احمد بن عبد الله ابن يونس قال انا ابو بكربن عياش عن حصين عن مجاهد قال صليت خلف ابن عمر فلم يكن يرفع يديه الا فى التكبيرة الاولى من الصلوة-
অর্থাৎ: তরজুমাতুল বাব ও অন্যান্য জায়গায় বর্ণিত হাদিসের জবাব প্রদান করে ওলামায়ে কেরাম বলেন, উল্লেখিত হাদিস সমূহের উপর ইসলামের প্রথম যুগে আমল করা হত, পরবর্তীতে তার আমল রহিত হয়ে যায়। আমল রহিত হওয়ার দলিল হিসেবে উল্লেখ রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা:) তিনি এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন নামাযে রুকুতে যাওয়ার সময় ও উঠার সময় হাত উত্তোলন করতেছেন এটা দেখে তিনি নামাজী ব্যক্তিকে বললেন তুমি রুকুতে যাওয়ার সময় এবং উঠার সময় হাত উত্তোলন করিও না, কেননা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম দিকে এ আমল করলেও পরবর্তীতে তা বর্জন করেন। আর এই আমল রহিত হওয়ার দলীল ইমাম ত্বহাভী (রা:) সহিহ সূত্রে হযরত মুজাহিদ (রা:) হতে হাদিস বর্ণনা করে বলেন- আমি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) এর পিছনে নামাজ আদায় করেছি, তিনি ‘তাকবিরে ঊলা’ ব্যতীত কোন সময় হাত উত্তোলন (রফয়ে ইয়াদাইন) করেননি।১১
উপরুক্ত দলিল ছাড়াও رفع اليدين না করার ব্যাপারে আরো অনেকগুলো নির্ভরযোগ্য দলিল রয়েছে। ইমাম আ’যম আবূ হানিফা (রা:) رفع اليدين এর ব্যাপারে যে সমাধান দিয়েছেন এটাই সঠিক। তিনি নির্ভরযোগ্য দলিলের ভিত্তিতেই এই সমাধান দিয়েছেন।
সত্যিকার অর্থে কুরআন-হাদীস সম্পর্কে তাদের সঠিক জ্ঞান নেই। এবং ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এর জ্ঞান সম্পর্কেও তাদের কোন ধারণা নেই। ইমামে আ’যম আবূ হানিফা (রা:) যেভাবে প্রত্যেকটি বিষয়ের সমাধান দিয়েছেন আজ পর্যন্ত কেউ এত সুন্দর সমাধান দিতে পারেনি এবং উনার প্রদত্ত সমাধান আদৌ পর্যন্ত কেউ খন্ডাতে পারেনি।
ইমাম আওযায়ী (রা:) যিনি ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এর সমকালীন মুজতাহিদ ও মুহাদ্দিস ছিলেন তিনি একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রা:) কে বলেন- من هذا المبتدع الذى خرج بالكوفة فيكنى اباحنيفة”কূফায় গজিয়ে উঠা এই বেদাতীর পরিচয় কি? যাকে আবূ হানিফা উপনামে ডাকা হয়”?১২ ইমামে আ’যম আবূ হানিফা (রা:) এর প্রাণাধিক শিষ্য ইবনে মুবারক এ কথা শুনে চুপ থাকেন, এ সময় তিনি কিছু জটিল ও দুর্বোধ্য মাসআলা বর্ণনা করেন এবং সর্বজনগ্রাহ্য ফতোয়ার দিক নির্ণয় করেন। ইমাম আওযায়ী (রা:) বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে বলেন, কে দিয়েছে এই ফতোয়া? ইবনে মুবারক বলেন, ইরাকের জৈনিক শায়খ যার সাক্ষাতে এই মাসআলা ও ফতোয়া জেনেছি। ইমাম আওযায়ী (রা:) বলেন, যিনি এই ফতোয়া দিয়েছেন তিনি মাশায়েখকুল শিরমণি। যাও তার কাছে গিয়ে আরো দ্বীনি এলেম শিখ। ইবনে মুবারক বললেন- সেই শায়খের নাম আবূ হানিফা। পরবর্তীতে মক্কায় ইমামে আ’যম (রা:) এর সাথে ইমাম আওযায়ী (রা:) এর সাক্ষাৎ হয় এবং অনেক মাসআলা নিয়ে আলোচনা (তর্ক-বিতর্ক) হয়। অবশেষে ইমাম আওযায়ী (রা:) ইমাম আবূ হানিফা (রা:) সম্পর্কে বলেন-
غبطت الرجل بكثرة علمه ووفورعقله واستغفرالله تعالى لقد كنت فى غلط ظاهر والزم الرجل فانه بخلاف ما بلغنى عنه-
“লোকটার গভীর জ্ঞান ও অসামান্য বুদ্ধি বিবেকের প্রতি খামোখাই সমালোচনার তীর ছুড়েছি। এজন্য আল্লাহর কাছে পানাহ্‌ চাই। সত্যি বলতে কি আমি প্রকাশ্য ভুলের মাঝে ছিলাম। মহামানবের চরিত্রে এলজাম দিয়েছিলাম। লোকমুখে যা শুনেছি এর থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।”১৩
লোকমুখে শুনে ইমাম আওযায়ী (রা:) ইমাম আবূ হানিফা (রা:) সর্ম্পকে সঠিক ধারণা পোষণ করেননি। কিন্তু যখন ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এর গভীর জ্ঞানের কথা শুনলেন তখন তিনি তাকে মাশায়েখকুল শিরমণি বলেছেন। আর আজকে যারা ইমাম আবূ হানিফা (রা:) সর্ম্পকে মন্তব্য করার মত দু:সাহস করে তাদের অস্তিত্ব ঠিক আছে কিনা খবর নাই। অবস্থা দেখে মনে হয় তারা আধুনিক যুগের সংস্কারক।
তারা বলতে চায় ইমাম আ’যম হাদিস জানতেন না। তাদের সকলের জ্ঞান-চিন্তাভাবনা এক করলে যার এক ফুটা ঘামের সমান হবে না; তাঁর সম্পর্কে এমন মন্তব্য মুনাফিক ছাড়া কে করবে।
তিনি সেই ইমাম যিনি মাসআলাসমূহের উসূল বের করতেন। আর সেই উসূলের ভিত্তিতে আনুসঙ্গিক হাজারো মাসআলার উন্মেষ ঘটাতেন। শুধু তাই নয়, তিনি এমন ইমাম যিনি ঘটনা ঘটার আগে ঘটিতব্য বিষয়ের সমাধান বের করে রাখতেন।
ইমাম আ’যম (রা:) এর ফিক্বহশাস্ত্রের সংকলনে আইন-বিধি প্রণয়নের পদ্ধতি সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব বর্ণনাটি বিশেষ প্রনিধানযেগ্য। তিনি বলেন, আমি সর্বাগ্রে কুরআনের সুস্পষ্ট বিধির অনুসরণ করি; সেখানে যদি সুষ্ঠ কোন নির্দেশ না পাই, তবে প্রামাণ্য হাদিসের অনুসন্ধান করি; সেখানে যদি কিছু না পায়, তবে সাহাবিদের মধ্যে মতবেধের ক্ষেত্রে তাঁর যেই অভিমত অধিকতর যুক্তিযুক্ত ও সমিচীন বিবেচিত হয় আমি তা অনুসরণ করি। তাদের সকলের অভিমত পরিত্যাগ করে আমি নতুন কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি না। যদি তাঁদের কারও কোন অভিমত না পাওয়া যায়, শুধু সে ক্ষেত্রে ইমাম নখ’ঈ, ইমাম শা’বী, হাসান বসরী, ইবনে সীরিন, সাঈদ ইবনে মুসায়্যাব প্রমুখ তাবি’ঈর ন্যায় আমি ইজতেহাদ করি।১৪
আহলে হাদিসদের আরেকটি অপপ্রচার- তারা বলে আবূ হানিফা (রা:) হাদীস ছেড়ে দিয়ে কিয়াসের উপর আমল করেন। এটা সম্পূর্ণ বানোয়াট কথা। আসলে এরা এখন যেমন আছে ইমাম আ’যম (রা:)-এর সময়েও ছিল। যেমন : ইমাম আ’যমের (রা:) প্রসিদ্ধ শিষ্য আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক ইমাম আয’ম (রা:) ও ইমাম বাকের (রা:) এর সাথে সাক্ষাত লাভের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ইমাম আ’যম (রা:) হযরত ইমাম বাকের (রা:) এর সাথে মদিনা শরীফে সাক্ষাত লাভ করেন। ইমাম আ’যমের উপর অনেক ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি হাদিস ছেড়ে দিয়ে কিয়াসের উপর আমল করার অপবাদ দেন, তাই যখন সাক্ষাত হয় তখন ইমাম বাকের (রা:) ইমাম আ’যম আবূ হানিফা (রা:) থেকে জিজ্ঞেস করলেন,انت الذى خالفت أحاديث جدي صلى الله عليه وسلم بالقياس؟
-আপনি কি ঐ ব্যক্তি যে অনুমানের উপর আমার নানার হাদীসের বিরোধীতা করেন?
ইমাম আ’যম (রা:) বলেন, আল্লাহর পানাহ্‌! আপনি তাশরীফ রাখুন, আমি আপনাকে আরয করি, আপনার ইজ্জত ও হুরমাত আমাদের উপর এত জরুরী, যে রকম আপনার দাদার ইজ্জত রক্ষা সাহাবিদের উপর জরুরী ছিল। তখন ইমাম বাকের (রা:) তাশরীফ রাখলেন ইমাম আ’যমও তাঁর সামনে বসলেন এবং আরয করলেন, আমি আপনার থেকে তিনটি কথা জানতে চাই, আপনি তাঁর সমাধান দেবেন? প্রথম প্রশ্ন হল- “পুরুষ দুর্বল না মহিলা দুর্বল”? তিনি বললেন, “মহিলা”। অতঃপর ইমাম আবূ হানিফা (রা:) জিজ্ঞেস করলেন, “মহিলাদের মিরাসে কত অংশ”? তিনি বললেন, মহিলার অংশ পুরুষের অর্ধেক। এ উত্তর শুনে ইমাম আবূ হানিফা (রা:) বললেন, -এটা আপনার নানার ইরশাদ, যদি আমি কিয়াসের মাধ্যমে আপনার নানার কথাকে পরিবর্তন করতে চাইতাম তখন -”পুরুষকে এক অংশ দিতাম ও মহিলাকে ডাবল দিতে বলতাম”। কেননা, মহিলা পুরুষের চেয়ে দুর্বল।
অতঃপর ইমাম আ’যম (রা:) দ্বিতীয় প্রশ্ন তুলে ধরলেন, “নামায উত্তম, না রোযা”? ইমাম বাকের (রা:) বলেন, “নামায”। তখন আবূ হানিফা (রা:) বলেন, -এটা আপনার নানার ইরশাদ, যদি আমি কিয়াসের মাধ্যমে আপনার নানার দ্বীনকে পরিবর্তন করতে চাইতাম, মহিলা যখন হায়েয থেকে পবিত্রতা অর্জন করবে তখন যুক্তি দিয়ে বলতাম, “সে রোজা কাযা করার পরিবর্তে যেন নামায কাযা করে”। কারণ, রোযার চেয়ে নামায উত্তম।
অতঃপর ইমাম আ’যম (রা:) তৃতীয় প্রশ্ন করলেন, “পেশাব বেশী নাপাক, না বীর্য”? ইমাম বাকের (রা:) বলেন, “পেশাব”। তখন ইমাম আ’যম (রা:) বললেন, -”যদি আমি যুক্তি দিয়ে আপনার নানার কথা পরিবর্তন করতে চাইতাম, তখন আমি ফতওয়া দিতাম “পেশাব করলে গোসল করতে হবে এবং বীর্য বের হলে অযূ করতে হবে”। কেননা পেশাব বীর্য থেকে বেশী নাপাক। কিন্তু আমি আপনার নানার ধর্ম পরিবর্তন করা থেকে আল্লাহর আশ্রয় কামনা করছি”।
এ কথা শুনা মাত্র ইমাম বাকের (রা:) নিজ আসন থেকে উঠে আবূ হানিফার (রা:) এর সাথে আলিঙ্গন করলেন এবং কপালে চুমু খেলেন।১৫
এ বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, ইমাম আ’যম (রা:) এর কুরআন ও হাদিস অনুধাবন এবং দূরদর্শিতার বিপরীতে বিরোধীরা তাঁর বিরুদ্ধে এত অভিযোগ উত্তাপন করেছিল যে ইমাম বাকের (রা:) এর মত লোকও তাঁর ব্যাপারে সংকোচ প্রকাশ করেছেন। যখন ইমাম আ’যম (রা:) বিভিন্ন উপমার মাধ্যমে দূরদর্শিতা প্রকাশ করলেন তখন ইমাম বাকের (রা:) শুধু নিজ অভিযোগ প্রত্যাহার করেননি; বরং ইমাম আ’যম (রা:) এর জ্ঞানের গভিরতার স্বীকৃতি দিলেন। তার সমর্থনে নিম্নোক্ত র্বণনাও বিদ্যমান।
এক সময় ইমাম আ’যম (রা:) মক্কা মুকাররামায় ইমাম মুহাম্মদ বাকের (রা:) এর নিকট উপস্থিত হলেন তখন তিনি আবূ হানিফা (রা:) কে দেখে বলেন, আবূ হানিফা! আপনাকে দূরদৃষ্টি দিয়ে দেখতেছি- আপনি আমার নানার মুছে যাওয়া সুন্নাতকে জিবীত করবেন। আপনি প্রত্যেক দুঃখীকে সাহায্য করবেন এবং প্রত্যেক বিপদগ্রস্থের ডাকে সাড়া দিবেন। বিপদগ্রস্থলোক যখন নিরুপায় হবে তখন আপনার শরণাপন্ন হবে। আপনি পথহারা ব্যক্তিদেরকে পথের দিশা দিবেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সাহায্যপ্রাপ্ত হবেন। এমনকি আপনি রাস্তায় আল্লাহওয়ালাদের সাথে থাকবেন।১৬
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আওলাদ হযরত ইমাম বাকের (রা:) ইমাম আবূ হানিফা (রা:) সম্পর্কে এত সুন্দর বর্ণনা দিয়ে গেলেন। বললেন আপনি আমার নানার সুন্নাতকে জিবীত করবেন। অথচ আজকে লা-মাযহাবী সম্প্রদায় ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এর মাযহাব বাদ দিয়ে নিজেরা মনগড়া মাযহাব প্রতিষ্ঠিত করে সাধারণ মুসলমানকে বিভ্রান্ত করছে। সুতরাং এই নব্য ফেতনা লা-মাযহাবীদের থেকে আমাদেরকে অবশ্যয়ই দূরে থাকতে হবে। তাদেরকে সর্বাবস্থায় প্রতিহত করতে হবে।
লা-মাযহাবী সম্প্রদায় বুখারী বুখারী বলতে বলতে তাদের “বুখার”(জ্বর) এসে যায় অথচ, ইমাম বুখারী (রহ:) ইমাম আ’যম আবূ হানিফা (রা:) সম্পর্কে বলেন -”মুহাদ্দিসগণ তাঁর থেকে বর্ণনা করনে, তাঁর মতামত গ্রহণে ও তাঁর হাদীস গ্রহণ করনে নিশ্চুপ ছিলেন”।১৭
তাই সবশেষে একথাই বলা যায় যে, তিনি শুধু ফিক্বাহর ইমাম ছিলেন না; তিনি হাদিসেরও ইমাম ছিলেন। তিনি মুজতাহিদই নয় বরং তিনি ছিলেন একজন “তাবি’ঈ”।১৮
যে যুগকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম خير القرون বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ইমাম সা’দ তাঁকে ৫ম স্তরের অন্তরর্ভূক্ত বলেছেন। ইমাম আবূ হানিফা (রা:), আনাস ইবনে মালেক (রা:), আবদুল্লাহ ইবনে আবি আওফা (রা:), সাহল ইবনে সা’দ (রা:), আবুত-তুফাইল আমির ইবন ওযাদিলো (রা:) এর মত মহান সাহাবিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাত পেয়ে নিজেকে ধন্য করেছেন।১৯
আর আজকে আমরা এই যুগে এসে ইমাম আ’যমের ব্যাপারে মন্তব্য করছি একটুক্তি চিন্তা-গবেষণা করে দেখেছি আমি কে আর ইমাম আ’যম কে? আমি কার সমালোচনা করছি। কার ব্যাপারে বলছি তিনি হাদিস জানতেন না, কোন মাযহাবকে না মানার জন্য বলছি। যারা এই সমস্ত কথা বলে তাদের জ্ঞান, চিন্তা-ভাবনা যেখানে শেষ ইমাম আ’যম আবূ হানিফা (রা:) এর জ্ঞান, চিন্তা-ভাবনা সেখান থেকে শুরু।
সুতরাং ইমাম আবূ হানিফা (রা:) সম্পর্কে কোন মন্তব্য না করে এবং তাঁর প্রদত্ত মাসআলা তথা হানাফি মাযহাব অনুসারে নিজের জিবনকে বাস্তবায়ন করাই একজন আলেম ও প্রকৃত জ্ঞানীর কাজ। আল্লাহ পাক আমাদেরকে সহিহ বুঝ ও সে অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন।
আমীন! বিহুরমাতি সায়্যিদিল মুরসালিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
তথ্যসূত্র :
০১. খতিবে বাগদাদী : তারিখে বাগদাদ, ১৩/৩২৬; যাহাবী : সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ৬/৩৯৫।
০২. ইবনে হাজার হায়তামী : আল খায়রাতুল হিসান, পৃষ্ঠা : ৩১।
০৩. মুসলিম শরীফ : আস সহীহ, কিতাবু ফাযায়িলিস সাহাবা, باب فضل فارس ৪/১৯৭২, হাদিস : ২৫৪৬।
০৪. মানাক্বিবুল ইমামিল আ’যম আবী হানিফা, ১/৫৯।
০৫. মানাক্বিবুল ইমামিল আ’যম আবী হানিফা, ১/৫৬।
০৬. মুফেক : মানাক্বিবুল ইমামিল আ’যম আবী হানিফা, ১/৩৮; ইবনে বায্‌যায করদরী : মানাক্বিবুল ইমামিল আ’যম আবী হানিফা, ১/৬৮।
০৭. ইবনে হাজার মক্কী : আল খায়রাতুল হিসান, পৃষ্ঠা : ৩৬।
০৮. আসকালানী : তাহযিবুত্‌ তাহযীব ১/৪৪৯।
০৯. করদরী : মানাক্বিবুল ইমামিল আ’যম আবী হানিফা: ১/২২৬।
১০. আল খায়রাতুল হিসান, পৃষ্ঠা : ৮২।
১১. বুখারী : পৃষ্ঠা :১০২ হাশিয়া।
১২. আল মিযানুল কুবরা
১৩. আস সাহমূল মুসিব ফী তানিবিল খতিব।
১৪. আসকালানী : তাহযিবুত্‌ তাহযীব, ১/৪৫১; খতিবে বাগদাদী : তারিখে বাগদাদ, ১৩/৩৬৮; আল-ইনতিকা পৃষ্ঠা ১৪২-১৪৪; মানাক্বিবু ইমাম আবী হানিফা, ১/৮০-৮১।
১৫. মুফেক : মানাক্বিবুল ইমামিল আ’যম আবী হানিফা, ১/১৬৮; ইবনে হাজর মক্কী : আল খাইরাতুল হিসান, পৃষ্ঠা : ৭৬; আবূ যাহারা : আবূ হানিফা, পৃষ্ঠা : ৭১।
১৬. করদরী : মানাক্বিব-ই ইমাম-ই আ’যম, ১/৩১।
১৭. বুখারী : আত তারিখুল কবীর, ৮/৮১।
১৮. ইবনূন-নাদীম, পৃষ্ঠা : ১০১; ইসলামি বিশ্বকোষ : ইসলামি ফাউন্ডেশন, ২/৩৫৯।
১৯. ইসলামি বিশ্বকোষ : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২/৩৫৯।

Wednesday, May 15, 2013

ইমাম আবু হানীফা রাহ. হাফিযুল হাদীসও ছিলেন : একটি প্রশ্ন ও তার উত্তর

- মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া আব্দুল্লাহ

  

আবুল কালাম, শান্তিনগর, নারায়ণগঞ্জ

প্রশ্ন : আমরা জানি যে, ইমাম আবু হানীফা রাহ. ইসলামী শরীয়তের অনেক বড় ইমাম ছিলেন। এ কারণেই আমরা তাঁর নির্দেশনামত কুরআন-সুন্নাহর বিধি বিধানের উপর আমল করি। কিন্তু কদিন আগে আমার এক বন্ধু  বললেন, জনৈক আহলে হাদীস তাকে বলেছেন, ‘আবু হানীফা হাদীস ও সুন্নাহর আলিম ছিলেন না। তিনি না হাফিযুল হাদীস ছিলেন, না হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে ছিকা ও নির্ভরযোগ্য ছিলেন।
একথা  শুনে  আমি খুব আশ্চর্য হলাম। কারণ তিনি যখন হাফিযুল হাদীসও ছিলেন না, হাদীসশাস্ত্রে পারদর্শীও ছিলেন না, এমনকি হাদীসের বিষয়ে ছিকাও ছিলেন না তখন তার  তাকলীদ করা কীভাবে বৈধ হবে? আমরা তো তাকলীদ এজন্যই করি, যাতে কুরআন কারীম এবং হাদীস-সুন্নাহর উপর আমাদের আমল নির্ভুল হয়।
আমার ধারণা, ঐ আহলে হাদীস ভাইয়ের কথা ঠিক নয়। কারণ মুসলিম উম্মাহর ফিকহ-ফতোয়ার একজন ইমাম হাদীস-সুন্নাহর বিষয়ে অজ্ঞ হবেন তা কী করে হয়? ফিকহ ও ফতোয়ার মূল ভিত্তিই তো কুরআন-সুন্নাহ।
এখন আমার আবেদন, হাদীসের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর অবস্থান সম্পর্কে আমাকে কিছু তথ্য সরবরাহ করবেন এবং এ বিষয়ে আরবী-উর্দূ কিছু কিতাবের নামও জানাবেন।
আরো আবেদন, ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর জীবনীর উপর বাংলা ভাষায় একটি সমৃদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ প্রস্ত্তত করে তা প্রকাশের ব্যবস্থা করবেন। আল্লাহ আপনাকে জাযায়ে খায়ের দান করুন। আমীন।

উত্তর : আপনার এ কথা ঠিক যে, ফিকহ ও ফতোয়ার একজন ইমাম হাদীস ও সুন্নাহ সম্পর্কে অজ্ঞ হওয়া অসম্ভব। এ তো সাধারণ বুদ্ধির কথা। আপনি যে ঐ আহলে হাদীস ব্যক্তির কথা শোনামাত্র সংশয়গ্রস্ত হননি; বরং সাধারণ বিচার-বুদ্ধি কাজে লাগিয়েছেন এজন্য আপনাকে মোবারকবাদ।  ইমাম আবু হানীফা রাহ. সম্পর্কে ঐ ব্যক্তি যা বলেছে তা সম্পূর্ণ অবাস্তব। আল্লাহ তাআলা তাকে হেদায়াত দান করুন এবং ইমামগণের প্রতি কুধারণা পোষণের ব্যাধি  থেকে মুক্তি দান করুন।
বাস্তবতা এই যে, ইমাম আবু হানীফা রাহ. হাদীসের অনেক বড় আলিম ছিলেন। তিনি হাফিযুল হাদীসও ছিলেন এবং হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে ছিকা ও নির্ভরযোগ্যও ছিলেন।
উসূলে হাদীস ও উসূলে ফিকহের সর্বসম্মত মূলনীতি এই যে, উম্মাহর ইমামগণের বিষয়ে এই প্রশ্নই ভুল যে, ‘কে তাদেরকে ছিকা বলেছে’। কারণ, এ ধরনের প্রশ্ন তো হয় সাধারণ রাবীদের ক্ষেত্রে, ইমামগণের ক্ষেত্রে নয়। কারণ ইমামগণের বিশ্বস্ততা ও নির্ভরযোগ্যতা; বরং উম্মাহর ইমামের মর্যাদায় উপনীত হওয়া তো এক দুই ব্যক্তির স্বীকৃতির দ্বারা নয়  ইজমা ও তাওয়াতুর (তথা ঐকমত্য ও ব্যাপক বর্ণনা) দ্বারা প্রমাণিত।
এরপরও আপনি যদি প্রশান্তির জন্য ‘হাদীস শাস্ত্রে ইমাম আবু হানীফার অবস্থান’ সম্পর্কে বিস্তারিত ও প্রামাণিক জ্ঞান অর্জন করতে চান তাহলে নিম্মোক্ত কিতাবসমূহ পাঠ করতে পারেন।
বলাবাহুল্য যে, এখানে শুধু নমুনা হিসেবে কয়েকটি কিতাবের নাম লেখা হচ্ছে। এ বিষয়ের সকল রচনাবলির তালিকা দেওয়া তো কোনো সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধের দ্বারা সম্ভব নয়।
১. ‘‘ইমাম আযম আওর ইলমে হাদীস’’, মাওলানা মুহাম্মাদ আলী সিদ্দীকী কান্ধলভী।
২. ‘‘মাকামে আবু হানীফা’’, মাওলানা সরফরায খান সফদর
৩. কিতাবুল আছার, ইমাম আবু হানীফা-এর বিভিন্ন ভূমিকা। যেমন :
ক. মুফতী মাহদী হাসান শাহাজাহানপুরী রাহ.-এর ভূমিকা (কালাইদুল  আযহার)
খ. মুহাদ্দিস আবুল ওয়াফা আফগানী রাহ.-এর ভূমিকা (ইমাম মুহাম্মাদ (রাহ)-এর রেওয়ায়েতের উপর)
গ. মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রশীদ নুমানী রাহ.-এর ভূমিকা (উর্দু, আররহীম একাডেমী, করাচী থেকে প্রকাশিত)
৪. মুসনাদে ইমাম আযম-এর ভূমিকা, মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রশীদ নুমানী রাহ.
৫. ‘‘মাকানাতুল ইমাম আবী হানীফা ফিল হাদীস’’, মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রশীদ নু’মানী  (১৪২০হি.)
৬. ‘‘আল-ইমাম আবু হানীফা ওয়া আসহাবুহুল মুহাদ্দিসুন’’, আল্লামা যফর আহমদ উছমানী রাহ. (১৩৯৪ হি.)
৭. ‘‘উকূদুল জুমান ফী মানাকিবিল ইমামিল আযম আবু হানীফাতান নু’মান’’, মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ আসসালেহী আশ-শাফেয়ী (৯৪২হি.)
৮. সিয়ারু আলামিন নুবালা, শামসুদ্দীন আযযাহাবী রাহ. (৭৪৮হি.) খন্ড : ৬; পৃষ্ঠা : ৩৯০-৪০৩
৯. আল ইনতিকা ফী ফাযাইলিছ ছালাছাতিল ফুকাহা (মালিক ইবনু আনাস ওয়া মুহাম্মাদ ইবনু ইদরীস আশ-শাফেয়ী, ওয়া আবী হানীফা) ইবনু আব্দিল বার আলমালেকী (৩৬৩হি.)
১০. ‘‘ফাযাইলু আবী হানীফা ওয়া আখবারুহূ ওয়া মানাকিবুহু’’, আবুল কাসিম ইবনু আবিল আওয়াম (৩৩৫হি.)
এ বিষয়ে আরো কিতাবের নাম জানতে চাইলে ‘‘উকূদুল জুমানের’’ শুরুতে আল্লামা আবুল ওয়াফা আফগানী রাহ.-এর ভূমিকা অবশ্যই পাঠ করুন। তদ্রূপ ইমাম আবু আব্দিল্লাহ আল-হুসাইন ইবনে আলী আস-সাইমুরী (৪৩৬ হি.)-এর কিতাব- ‘আখবারু আবী হানীফাতা ওয়া আসহাবিহী’, যা আফগানী রাহ.-এর তাহকীকে ছাপা হয়েছে, এর ভূমিকাও পাঠ করতে পারেন।
মারকাযুদ দাওয়াহ-এর দারুত তাসনীফ থেকে এ বিষয়ে একাধিক কিতাব প্রকাশের বিষয়টি পরিকল্পনাধীন আছে। তবে আলকাউসারে একটি ধারাবাহিক লেখা অতি শীঘ্রই শুরু হবে ইনশাআল্লাহ।
আপাতত শুধু দুইটি বিষয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি :
এক. ইমাম আবু হানীফা রাহ. হাদীসেরও ‘হাফিয’ ছিলেন।
এটি একটি বাস্তবতা, যার অনেক দলীল আছে। এখানে শুধু একটি বিষয় নিবেদন করছি। তা এই যে, মুসলিম উম্মাহর হাফিযুল হাদীসগণের বিষয়ে মুহাদ্দিসগণ আলাদা গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার অধিকাংশই এখন মুদ্রিত ও প্রকাশিত। এগুলোর কোনো একটি গ্রন্থ আপনি হাতে নিন। তাতে ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর আলোচনা পাবেন। যেমন :
১. তাযকিরাতুল হুফফায, শামসুদ্দীন আযযাহাবী (৭৪৮হি.)
যাহাবী রাহ. এই কিতাবের শুরুতে লিখেছেন-
هذه تذكرة بأسماء مُعَدلي حملة العلم النبوي، ومن يرجَع إلى اجتهادهم في التوثيق والتضعيف والتصحيح والتزييف.
   অর্থাৎ এ গ্রন্থে ইলমে নবুওয়াতের ঐ বিশ্বস্ত ধারক-বাহকগণের আলোচনা রয়েছে, যাদের সিদ্ধান্ত ও গবেষণার শরণাপন্ন হতে হয়  ছিকা ও যয়ীফ রাবী নির্ণয় এবং সহীহ ও যয়ীফ হাদীস চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে।’
এরপর যাহাবী রাহ. এ গ্রন্থের খন্ড ১ পৃষ্ঠা ১৬৮-এ ইমাম আবু হানীফা রাহ-এর আলোচনা লিখেছেন। আলোচনার শিরোনাম-‘আবু হানীফা আল-ইমামুল আযম’
(أبو حنيفة الإمام الأعظم)
২. আল মুখতাসার ফী তবাকাতি উলামাইল হাদীস, শামসুদ্দীন ইবনু আব্দিল হাদী (৭৪৪হি.)
এর কিছু অংশ মুদ্রিত। এর হস্তলিখিত পান্ডুলিপি জামেয়া ইসলামিয়া মদীনা মুনাওয়ারায় সংরক্ষিত আছে।
৩. আত তিবয়ান লিবাদীআতিল বায়ান আন মাওতিল আ’য়ান, শামসুদ্দীন ইবনু নাসিরুদ্দীন (৮৪২হি.)
এ গ্রন্থের পান্ডুলিপি মদীনা মুনাওয়ারার ঐতিহাসিক কুতুবখানা মাকতাবা আরিফ হিকমত-এ সংরক্ষিত আছে।
৪. তবাকাতুল হুফফায, জামালুদ্দীন ইবনুল মিবরাদ (৯০৯হি.)
এ কিতাব থেকে মুহাদ্দিস আবদুল লতীফ সিদ্দিকী রাহ. ‘‘যাববু যুবাবাতিদ দিরাসাত আনিল মাযাহিবিল আরবাআতিল মুতানাসিবাত’’ গ্রন্থে ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর আলোচনা উদ্ধৃত করেছেন।
৫. ‘‘তবাকাতুল হুফফায’’, জালালুদ্দীন সুয়ূতী রাহ. (৯১১হি.)
৬. ‘‘তারাজিমুল হুফফায’’, মুহাম্মাদ ইবনে রুসতম আল হারিছি আলবাদাখশী
এ গ্রন্থের পান্ডুলিপি নদওয়াতুল উলামা লাখনৌতে রয়েছে। এই পুরো আলোচনার জন্য হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রশীদ নু’মানী রাহ.-এর কিতাব ‘‘মাকানাতুল ইমামি আবী হানীফাতা ফিল হাদীস’’ (পৃ. ৫৮-৬৮) পাঠ করুন। ওখানে আরো তথ্য রয়েছে। উপরোক্ত তথ্যগুলোও ওখান থেকে নেওয়া হয়েছে ।
দুই. ইমাম আবু হানীফা ‘হাফিযুল হাদীস’ হওয়া একটি সহজ সত্য
দ্বিতীয় যে বিষয়ে আপনার মনোযোগ আকর্ষণ করছি তা এই যে, ইমাম আবু হানীফা রাহ. ‘সুন্নতে মুতাওয়ারাছা’ এবং হাদীস ও আছারের হাফিয হওয়া এমন এক সহজ স্বাভাবিক বাস্তবতা, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কারণ ঐতিহাসিক সত্য এই যে, ইমাম আবু হানীফা রাহ. ফিকহ ও ফতোয়ার প্রথম সংকলক। আর এ তো বলাই বাহুল্য যে, শরীয়তের এই সকল বিধান তিনি ফিকহের কিতাব থেকে সংকলন করেননি। কারণ ফিকহের প্রথম সংকলকই তো তিনি। তাহলে এই সকল বিধান তিনি কোথা থেকে সংকলন করেছেন? নিশ্চয়ই সুন্নতে মুতাওয়ারাছা, আছারে সাহাবা ও ফতওয়ায়ে তাবেয়ীন থেকে। তাহলে তাঁর উপরোক্ত সকল বিষয়ের হাফিয হওয়া দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট।
এখানে ঐ ঘটনাটি উল্লেখ করা সমীচীন মনে হচ্ছে, যা মুয়াফফাক আলমক্কী রাহ. (৫৬৪ হি.) ‘মানাকিবু আবী হানীফা’’ গ্রন্থে (খন্ড ২, পৃষ্ঠা : ১৫১-১৫২) আবু ইসমা সা’দ ইবনে মুয়ায রাহ.-এর উদ্ধৃতিতে উল্লেখ করেছেন। তিনি আবু সুলায়মান জুযাজানী থেকে, তিনি ইমাম মুহাম্মাদ রাহ. থেকে, আর তিনি ইমাম আবু ইউসুফ রাহ. থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম আবু ইউসুফ বলেন-
كنا نكلم أبا حنيفة في باب من أبواب العلم، فإذا قال بقول واتفق عليه أصحابه درت على مشايخ الكوفة هل أجد في تقوية قوله حديثا أو أثرا؟ فربما وجدت الحديثين أو الثلاثة فآتيه بها، فمنها ما يقبله ومنها ما يرده، فيقول : هذا ليس بصحيح أوليس بمعروف، وهو موافق لقوله! فأقول له : وما علمك بذلك؟ فيقول : أنا عالم بعلم الكوفة.
 ‘আমরা আবু হানীফা রাহ.-এর সাথে একটি অধ্যায় নিয়ে আলোচনা করতাম। এরপর যখন তিনি সিদ্ধান্ত দিতেন এবং তার সঙ্গীরাও একমত হতেন তখন আমি কুফার শায়েখগণের  কাছে যেতাম তার সিদ্ধান্তের সমর্থনে আরো কোনো হাদীস বা আছর পাই কিনা। কখনো দুইটি বা তিনটি হাদীস পেতাম। তাঁর কাছে পেশ করার পর তিনি কোনোটি গ্রহণ করতেন আবার কোনোটি এই বলে বর্জন করতেন যে, এটি সহীহ নয় বা মারুফ নয়। অথচ তা তার সিদ্ধান্তের অনুকূলে। আমি বলতাম, এ সম্পর্কে  আপনার ইলম কীরূপ। তিনি বলতেন, আমি কূফা নগরীর ইলমের ধারক।
এই ঘটনা বর্ণনা করার পর আবু ইসমা যা বলেছেন তার সারকথা এই যে, ‘ইমাম রাহ. সত্য বলেছেন। সত্যি তিনি ছিলেন কুফার মনীষীগণের কাছে সংরক্ষিত ইলমের ধারক। শুধু তাই নয় (হাদীস আছার এবং কুরআন-সুন্নাহর) অন্যান্য শহরের অধিকাংশ ইলমেরও তিনি ধারক ছিলেন। এর প্রমাণ পেতে চাইলে তাঁর কিতাবসমূহ দেখ, তাঁর সঙ্গীদের কাছে সংরক্ষিত তাঁর বর্ণনাসমূহ দেখ, কিতাবুস সালাত থেকে শুরু করে এক একটি অধ্যায় এবং প্রতি অধ্যায়ের এক একটি মাসআলা পাঠ করতে থাক, তাহলেই দেখতে পাবে, কীভাবে তিনি হাদীস ভিত্তিক জবাব দিয়ে চলেছেন এবং চিন্তা কর, হাদীস ও সালাফের আছারের সাথে তার জবাবসমূহ কত সামঞ্জস্যপূর্ণ।’’
আপাতত শুধু এই কটি কথা বলেই আলোচনা সমাপ্ত করছি। ইনশাআল্লাহ অতি শীঘ্র আলকাউসারের পাতায় আপনি ইমাম ছাহেব রাহ.-এর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে একটি বিস্তারিত প্রবন্ধ দেখতে পাবেন। আল্লাহ তাআলাই তাওফীকদাতা। তিনিই আমাদের সাহায্যকারী।

Source: http://www.alkawsar.com