Thursday, June 13, 2013

ইমাম আবু হানীফা (রহ.) তাবেয়ী ছিলেন।

ইমাম আবু হানীফা (রহ.) তাবেয়ী ছিলেন।
লিখেছেন: ' দ্য মুসলিম' 


এই উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম ছিলেন সাহাবায়ে-কেরাম। সাহাবীদের পরবর্তী মর্তবা হচ্ছে তাবেয়ীগণের। সর্বসম্মতভাবে সাহাবীর সংজ্ঞা হলোঃ যাঁরা ঈমানের সাথে হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন এবং ঈমান নিয়েই মৃত্যুবরণ করেছেন। আর তাবেয়ী হচ্ছেন, যাঁরা ঈমানের সাথে সাহবীগণের সাক্ষাত লাভ করেছেন এবং ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করেছেন। (নাখবাতুল-ফেকার)
সাহাবী এবং তবেয়ীগণের মর্যাদা নির্দেশ করে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- ঈমান আনার ব্যাপারে অগ্রবর্তিগণ, মুহাজের ও আনসারবৃন্দ এবং তাদের সৎকর্মের যারা অনুসরণ করেছেন তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করেছেন এবং তাঁরাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন।
হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, অত্যন্ত সৌভাগ্রবান সেই সমস্ত লোক যারা আমার সাক্ষাত লাভ করেছে এবং আমার সাক্ষাত যারা পেয়েছে, তাদেরকে পেয়েছে।
হযরত ইমরান ইবেন হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়া’লা আনহু থেকে বর্ণিত, হুজুর স. ইরশাদ করেন, “আমার উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম (যুগ) হলো আমার  (সাহাবীগণের) যুগ। অত:পর তৎপরবর্তী (তাবিঈনদের) যুগ। অত:পর তৎপরবর্তী (তাবি’তাবঈন) যুগ।”- বুখারী শরীফ (১/ ৩৬২ ও ৫১৫ পৃষ্ঠা), বুখারী শরীফ (২/ ৯৫১ পৃষ্ঠা), মুসলিম শরীফ (৩০৯ পৃষ্ঠা), আবু দাউদ শরীফ (২৯২ পৃষ্ঠা), তিরমিযী শরীফ (৪৫,৫৪ ও ২২৬ পৃষ্ঠা), ইবনে মাজাহ শরীফ (১৭২ পৃষ্ঠা)।
 ইমাম আবু হানীফার রহ. জন্ম ৮০ হিজরী সনে। সর্বাপেক্ষা বয়স্ক সাহাবী হযরত আবু তোফায়েল রা. ইন্তেকাল করেছেন ১১০ হিজরীতে। আবু হানীফার জন্মকাল থেকে নিয়ে একশত দশ হিজরী এই দীর্ঘ ত্রিশ বছর সময়কালের মধ্যে শতাধিক সাহাবী জীবিত ছিলেন। হাফেযুল হাদিস ইমাম মুযনীর রহ. বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম আবু হানীফা রহ. অন্যুন ৭২জন সাহাবীর সাক্ষাত লাভ করেছিলেন। (মুজামুল মুসান্নেফীন)
হাফেজ ইবনে হাজার আসক্বালানী রহ. বলেন, তাবেয়ী হওয়ার জন্য সাহাবীগণের সাক্ষাত লাভই যথেষ্ট। কেননা, হাদীস শরীফে শুধুমাত্র দেখা’র কথা বলা হয়েছে। সে মতে যারা তাবেয়ী হওয়ার জন্য দীর্ঘ সাহচর্য এবং সাহাবীগণের নিকট থেকে হাদিস বর্ণনা করাকেও শর্ত নির্ধারণ করেন তাদের বক্তব্য সঠিক নয়। (নুযহাতুননযর)
শায়খ আবুল হাসান হাফেজ ইবনে হাজারের উপরোক্ত বক্তব্যের ব্যাখ্যা করে বলেন- আল্লামা এরাক্বীর অভিমত অনুযায়ী এটাই অধিকসংখ্যক আলেমের অভিমত এবং এটাই সর্বাধীক গ্রহণযোগ্য তথ্য। কেননা, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বক্তব্য থেকে তাই প্রমাণিত হয়। সুতরাং হাদীসের বক্তব্য অনুযায়ী ইমাম আবু হানীফা রহ. সন্দেহাতীত ভাবে তাবেয়ীগণের অন্তর্ভুক্ত বলে প্রমাণিত হল। কেননা, তিনি আনাস ইবনে মালেক রা. এবং অন্য আরো কয়েকজন সাহাবীকে দেখেছেন। যেসব লোক ইমাম আবু হানীফকে রহ. তাবেয়ীদের মর্যাদা দিতে চান না, এরা নির্বোধ এবং বিদ্বষপরায়ন। (প্রাগুক্ত)
হাফেজ ইবনে হাজার আসক্বালানী রহ. আরো লিখেছেন- ইমাম আবু হানীফা রহ. বহুসংখ্যক সাহাবীর সাক্ষাত লাভ করেছেন। কেননা, তিনি ৮০ হিজরী সনে কুফায় জন্মগ্রহণ করেছেন এবং সেসময় সেই শহরে সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আবী আওফা রা. জীবিত ছিলেন। তাঁর ইন্তেকাল ৮০ হিজরীর অনেক পরে হয়েছে। তেমনি বসরাতে আনাস ইবনে মালেক রা. ছিলেন। তাঁর ইন্তেকাল হিজরী নব্বই সনে পরে হয়েছে। সে মতে ইমাম আবু হানীফা রহ. নিঃসন্দেহে তাবেয়ীগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। (তানসীকুন-নেজাম)
বুখারী শরীফের ব্যাখাগ্রন্হে ইবনে হাজার আসক্বালানী রহ. উপরোক্ত সিদ্ধান্তটি আলেমগণের সর্বসম্মত অভিমত বলে উল্লেখ করেছেন। হাফেজ যাহাবী রহ. বলেন, ইমাম আবু হানীফা রহ. সাহাবী হযরত আনাস ইবনে মালেককে রা. অনেকবার দেখেছেন। (খাইরাতুল-হেসান)
আল্লামা ইবনে হাজার মক্কী রহ. মেশকাত শরীফের ব্যাখ্যা গন্হে উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম আবু হানীফা রহ. অন্যুন আটজন সাহাবীর সাক্ষাত লাভ করেছেন।
এঁরা হচ্ছেন-
১) হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. (ওফাত ৯৩ হিজরী)
২) আব্দুল্লাহ ইবনে আবী আওফা রা. (ওফাত ৮৭ হিজরী)
৩) সহল ইবনে সাআদ রা. (ওফাত ৮৮ হিজরী)
৪) আবু তোফায়ল রা. (ওফাত ১১০ হিজরী)
৫) আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়দী রা. (ওফাত ৯৯ হিজরী)
৬) জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. (ওফাত ৯৪ হিজরী)
৭) ওয়াসেনা ইবনুল আসকা রা. (ওফাত ৮৫ হিজরী)
ইবনে সাআদ লিখেছেন- সার্বিক বিচারেই ইমাম আবু হানীফা রহ. একজন তাবেয়ী ছিলেন। তাঁর সতীর্থ ফেকাহর ইমামগণের মধ্যে আর কারো এই মর্যাদা লাভের সৌভাগ্য হয় নাই। (তানসীক্ব)
আল্লামা খাওয়ারেজমী রহ. বলেন- ওলামাগণের এ বিষয়ে ঐক্যমত রয়েছে যে, ইমাম আবু হানীফা রহ. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণের পবিত্র মুখ থেকে হাদিস শ্রবণ করে তা বর্ণনা করেছেন। তবে এরূপ হাদিসের সংখ্যা কত ছিল, এ সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে। (তানসীক্ব)
ইমাম আবু হানীফা রহ. কর্তৃক সাহাবীগণ থেকে বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা কারো মতে ছয়, কারো মতে সাত এবং কারো মতে আটখানা। যেসব সাহাবী থেকে ইমাম সাহেব হাদিস বর্ণনা করেছিলেন, তাঁদের নাম যথাক্রমে – আনাস ইবনে মালেক রা., আবদুল্লাহ ইবনে আবী আওফা রা., সহল আবনে সাআদ রা., আবু তোফয়ল রা., আমের ইবনে ওয়াছেলা রা., ওয়াছেলা ইবনে আশক্বা রা., মা’কাল ইবনে ইয়াসার রা., এবং জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. প্রমুখগণ।
হাদিস শাস্ত্রের ‘ আমিরুল মুমেনীন’ রূপে খ্যাত আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক স্বরচিত কবিতার এক পংক্তিতে উল্লেখ করেছেন যে, নোমান ( আবু হানীফা ) এর পক্ষে গর্ব করার মতো এতটুকুই যথেষ্ট যা তিনি সরাসরি সাহাবীগণের নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন।
ইমাম আবু হানীফা রহ. স্বয়ং একটি বর্ণনায় বলেন, আমার জন্ম হিজরী ৮০ সনে এবং ৯৬ সনে প্রথম হজে যাই। তখন আমার বয়স ষোল বছর। মসজিদুল-হারামে প্রবেশ করে দেখলাম, একটি বড় হালকায় বহু লোক সমবেত হয়ে রয়েছেন। আমি আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কিসের জমায়েত? তিনি বললেন, এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনুল হারেছের রা. পাঠদানের হালকা। এ কথা শুনে আমি সেদিকে অগ্রসর হলাম। তাঁকে বলতে শুনলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর দীন সম্পর্কিত গভীর জ্ঞান অর্জনে আত্মনিয়োগ করে, তার সকল প্রয়োজনের জিম্মাদার স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা হয়ে যান এবঙ তাকে এমন সব উৎস থেকে রিজিক পৌছাতে থাকেন, যা সে কখনো কল্পনাও করেনি। (মুসনাদে ইমাম আযম)
উল্লেখ্য যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হারেছের রা. ইন্তেকাল হয়েছে ৯৯ হিজরীতে। তখন ইমাম সাহেবের বয়স হয়েছিলো ১৯ বছর।
‘এলামুল-আখবার’ নামক গ্রন্হে বর্ণিত অন্য একখানা হাদিস ইমাম আবু হানীফা রহ. সরাসরি সাহাবী হযরত আনাস ইবনে মালেকের রা. নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন। উক্ত হাদিসে বলা হয়েছে যে, এলেম শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উপর ফরজ।
একই সুত্রে হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে ইমাম আবু হানীফা রহ. কর্তৃক বর্ণিত অন্য আর একখানা হাদিস হচ্ছে- পাখীরা আল্লাহর উপর যতটুকু ভরসা করে জীবন ধারন করে কোন বান্দা যদি ততটুকু ভরসা করতে শেখে তবে আল্লাহ পাক তাকেও অনুরূপ রিজিক দান করবেন। পাখীরা সকাল বেলায় খালি পেটে বের হয়ে যায়, সন্ধায় পেট ভরে বাসায় ফিরে আসে।
ইমাম সাহেব আর একখানা হাদিস সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবী আওফা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। হাদিস খানা হচ্ছে- যে ব্যক্তি মসজিদ নির্মাণ করবে আল্লাহ পাক তার জন্য বেহেশতে গৃহ নির্মাণ করবেন।
শেষোক্ত হাদিসখানাকে ইমাম জালালুদ্দিন সিয়ুতী রহ. মোতাওয়াতের হাদিস রূপে অভিহিত করেছেন।
মোল্লা আলী কারী রহ. বরেন, এই হাদিসটির অন্যুন পঞ্চাশটি সনদ আমি সংগ্রহ করেছি। তম্মধ্যে ইমাম আবু হানীফার রহ. মাধ্যমে বর্ণিত সনদিই সর্বোত্তম। 

কয়েক বছর আগে ড. মুহাম্মাদ আবদুশ শহীদ নোমানী দা. বা. ( প্রফেসর শবায়ে আরাবী , করাচী ইউনিভার্সিটি ) এর রচিত " ইমাম আবু হানিফা কি তাবেয়্যিআত আওর সাহাবা সে উনকি রেওয়ায়েত " ( ইমাম আবু হানিফা র. এর তাবেয়ী হওয়া ও সাহাবা থেকে তাঁর হাদিস বর্ণনা) মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়েছে।
ভূমিকাতে তিনি নিজেই লিখেছেন, " ..ইদানিং কিছু ব্যক্তিকে দু:খজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, ইমাম আবু হানিফা (র) সম্পর্কে অনেক মিথ্যা অপপ্রচার চালাতে....পাঠককে আমি আশ্বস্ত করছি আমি হানাফী মাযহাবের অনুসারী নই...!!"
এছাড়া ইমাম সাহেব বিপুল সংখ্যক তাবেয়ী মনীষীদের সাহচর্য পেয়েছেন। তাঁরা ছিলেন অসংখ্য সাহাবী ও তাঁদের সমসাময়িক প্রবীন তাবেয়ীদের সহচর্যে ধন্য। এজন্যে 'আমলে মুতাওরাস' অর্থাৎ কর্মগত ধারায় চলে আসা নবী সা. এর আমলকে যতটা কাছ থেকে দেখার সূযোগ পেয়েছেন, ততটা হাদিস ও ফিকাহর অন্যান্য ইমামের হয়নি। কেননা তাঁরা সবাই তাঁর পরের যুগের ছিলেন।

সুত্রঃ মাসিক মদিনা, জানুয়ারী ২০১০

ইমাম আবু হানিফা রঃ এর শাহাদাত বরনের ইতিহাস

ইমাম আবু হানিফা রঃ এর শাহাদাত বরনের ইতিহাস

 - এম আবদুল্লাহ ভূঁইয়া 

 

ইমাম আবু হানিফা চার প্রসিদ্ধ ইমামের মাঝে বড় ইমাম হিসাবে পরিচিত। পাক-ভারত উপমহাদেশে তাঁর মাযহাবের অনুসারীর সংখ্যাই বেশী। খলীফা মানসুরের সময় ইমাম আবু হানিফাকে প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহনের জন্য আহবান জানানো হয়। তিনি উক্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে খলীফাকে সম্বোধন করে বলেন, ’’ আল্লাহর শপথ, কোন ব্যাপারে আমার ফয়সালা যদি আপনার বিরুদ্ধে যায় এবং আপনি আমাকে হুকুম দেন যে হয়ত সিদ্বান্ত পাল্টাও না হলে তোমাকে ফোরাত নদীদে ডুবিয়ে মারা হবে। তখন আমি ডুবে মরতে প্রস্তুত থাকব তবু সিদ্ধান্ত পাল্টাতে পারবনা। তা ছাড়া আপনার দরবারে এমন অনেক লোক রয়েছে যাদের মনোতুষ্টি করার মত কাজীর প্রয়োজন।’’


ইমাম আবু হানিফা খলীফার প্রস্তাব প্রত্যখ্যান করার পর তাকে ত্রিশটি বেত্রাঘাত করা হয়। যার ফলে তাঁর সারা শরীর রক্তাক্ত হয়ে পড়ে। তখন খলীফা মানসুরের চাচা আব্দুস সামাদ ইবনে আলী তাকে এজন্য খুবই তিরষ্কার করে বলেন- “ইনি শুধু ইরাকের ফকীহ নন, সমগ্র প্রাচ্যবাসীর ফকীহ।’’ এতে মনসুর লজ্জিত হয়ে প্রত্যেক চাবুঘাতের বদলে এক হাজার দিরহাম ইমাম আবু হানিফার কাছে পাঠান।

ইমাম আবু হানিফা উক্ত দিরহাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। তখন তাকে বলা হয় তিনি এ অর্থ গ্রহণ করে নিজের জন্য না রাখলেও দুঃখী-গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দেন। এর জবাবে ইমাম বলেন- "তোমার কাছে কি কোন হালাল অর্থ রয়েছে ?

মানসুর এতে আরও প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠে। ইমামকে আরও চাবুকাঘাত করার আদেশ দেন। কারারুদ্ধ করে পানাহারে নানাভাবে কষ্ট দেয়া হয়। তারপর একটা বাড়ীতে নজরবন্দী করে রাখা হয়। সেখানেই ইমাম আবু হানিফার মৃত্যূ হয়। কারো কারো মতে তাঁকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। নির্মম নির্যাতনের শিকার ইমাম আবু হানিফা মৃত্যুর আগে অসিয়ত করে যান যে, খলীফা মানসুর জনগনের অর্থ অন্যায়ভাবে দখল করে বাগদাদের যেই এলাকায় শহর নির্মাণ করেছে সে এলাকায় যেন তাঁকে দাফন করা না হয়। মূলত খলীফা মানসুর তার ক্ষমতার স্বার্থেই ইমাম আবু হানিফাকে বিচারকের পদে নিয়োগ দিতে চেয়েছিলেন। তাই ইমাম তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ইমাম আবু হানিফা এই বিষয়টি স্পষ্ট করেই খলীফা মানসুরকে জানিয়ে দিয়ে বলেন- “আপনি আমাদেরকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ডেকে আনেননি। বরং আপনি চান যে আপনার ভয়ে যেন আমরা আপনার মর্জি মাফিক কথা বলি’’।

বর্তমান যামানায় ইমাম আবু হানিফা সর্বজন সমাদৃত। আজকে যে সকল মুসলিম শাসকগণ, ইমাম ও ইসলামী চিন্তাবিদদের উপর নির্যাতন করছেন কিংবা কারাবন্ধী করছেন তাদের অনেকেই ইমাম আবু হানিফার মাযহাব অনুসারী বলে দাবী করেন। কিন্তু ইতিহাস এই সত্যেরই সাক্ষী যে, সারা জাহানে ইমাম আবু হানিফার মর্যাদা এবং তৎকালীন জালিম শাসকদের মর্যাদায় আকাশ পাতাল পার্থক্য রয়েছে।

তথ্যসুত্র: ইসলামী চিন্তাবিদদের উপর নির্যাতন যুগে যুগে-১ 

 

ইন্তিকাল ও সমাধীস্হল :—

ইমাম আবু হানিফা হিজরী ১৫০ সন মুতাবিক ৭৬৭ খ্রিঃ খলিফা মনসুর কর্তৃক প্রয়োগকৃত বিষক্রিয়ার ফলে কারাগারে ইন্তিকাল করেন। ।তাঁর প্রথম জানাজায় লোকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৫০ হাজারেরও উপরে।৫/৬ দফায় তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় ৷ নির্মম নির্যাতনের শিকার ইমাম আবু হানিফা মৃত্যুর আগে অসিয়ত করে যান যে খলীফা মানুসর জনগনের অর্থ অন্যায়ভাবে দখল করে বাগদাদের যেই এলাকায় শহর নির্মান করেছে সে এলাকায় যেন এন্তেকালের পর তাঁকে দাফন করা না হয়। তার জানাজায় সর্বশেষ ইমামতি করেন তার পুত্র হাম্মাদ। তাকে খাজরান নামক স্থানে  সমাহিত করা হয়।

দাফনের পরও বিশ দিন পর্যন্ত তাঁর কবরের পাশে জানাজার নামাজ আদায় করা হয়।তার জন্য লোকজন মৃত্যুর ২০ দিন পর্যন্ত প্রার্থনা করেছিল। পরবর্তীতে, অনেক বছর পর বাগদাদের পাশে আধামিয়াতে আবু হানিফ মসজিদ নামে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হয় আবু হানিফার নামে।

 

Wednesday, June 12, 2013

অজু ছাড়া পবিত্র কোরআন মজিদ স্পর্শ করা যাবে কিনা ?


হানাফি মাযহাবের শ্রেষ্ঠত্বে ইমাম-ই আ’যম আবূ হানিফা (রা:)

হানাফি মাযহাবের শ্রেষ্ঠত্বে ইমাম-ই আ’যম আবূ হানিফা (রা:)

 মুহাম্মদ মোবারক হোসাইন

ইমাম আ’যম (রা:) এর শুভ জন্ম, নাম-উপনাম :-
আবু হানিফা নোমান ইবনে ছাবিত যওজী। ইমাম চতুষ্টয়ের মধ্যে অগ্রজ। মুসলিম সমাজে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা সর্বাধিক। জন্মকাল নিয়ে তিনটি মত আছে ১. ৬৩ হিজরী ২. ৭০ হিজরী ৩. ৮০ হিজরী। তৃতীয় মতটিই প্রসিদ্ধ। কেননা ইমাম আ’যম (রা:) এর পৌত্র ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ বলেন, “আমার দাদা ৮০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন”।১ বাগদাদে ১৫০ হিজরীতে ওফাত। উপাধী ইমামে আ’যম। তাঁর নামের শাব্দিক অর্থ পর্যালোচনায় দেখা যাবে তাঁর নামে ও কাজে পুরোপুরি মিল। আল্লামা ইবনে হাজার হায়তামী (রহ:) বলেন অর্থাৎ সকল ইমাম ঐক্যমত পোষণ করেন যে, তাঁর নাম নো’মান। এতে এক গূঢ় রহস্য রয়েছে ১. নো’মান এমন রক্ত, যা দ্বারা শরীরের কাঠামো প্রতিষ্ঠিত থাকে। ২. কেউ কেউ বলেন, নো’মানের অর্থ রুহ। ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এর মাধ্যমে ফিক্‌হে ইসলামীর কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ফিকহ শাস্ত্রের দলীলাদি ও বিভিন্ন দুরুহ বিষয়ের সমাধানের মূল। ৩. নু’মান অর্থ লাল সুগন্ধিযুক্ত ঘাস বা বেগুনি রঙের নাম। সে হিসেবে ইমাম আবূ হানিফার (রা:) অভ্যাস ভাল এবং তাঁর গুণাবলি পূর্ণতার শীর্ষে পৌছেছে। ৪. নু’মান শব্দটি “ফু’লান” শব্দের ওযনে “নি’মাত” শব্দ থেকে নির্গত হয়েছে। তখন অর্থ হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইমাম আ’যম মানুষের উপর এক বড় নিয়ামত।২
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পারস্যবাসীর এক ভাগ্যবান ব্যক্তির সুসংবাদ দিয়েছেন। সে হাদীসকে ইমাম মুসলিম (রহ:) হযরত আবূ হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণনা করেছেন। সরওয়ারে কায়েনাত হুজুর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
لو كان الدين عند الثريا لناله رجل من فارس او قال من ابناء فارس حتى يتناوله-
-যদি দ্বীন সপ্তর্ষিমণ্ডলস্থ সুরাইয়া সেতারার কাছে গচ্ছিত থাকে তখনও পারস্যবাসীর এক ব্যাক্তি তা অর্জন করে নেবে।৩
মুহাদ্দিসগণ বলেছেন এ হাদীসটি ইমাম আ’যম আবূ হানিফা (রা:) এর উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। এতে কোনো আলেম দ্বিমত পোষণ করেননি।
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী শাফেয়ী (রহ:) “তাবয়িযূস সহিফা” কিতাবে এবং ইমাম ইবনে হাজার মক্কী (রহ:) “আল খায়রাতুল হিসান” এর মধ্যে “ইমাম আ’যম আবূ হানিফার (রা:) এর ব্যাপারে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুসংবাদ” শিরোণামে অধ্যায় রচনা করেছেন।
শৈশবকাল ও শিক্ষা জীবন :-
শৈশব কেটেছে বসরার কূফা নগরিতে। তৎকালিন ইসলামী নগর হিসেবে কূফা খ্যাতি কুঁড়িয়েছিল।
্থ ফাজিল স্নতক শেষ বর্ষ ফলপ্রার্থী, কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদরাসা।
এখানে বড় বড় আলেমের মজলিশ বসত। ইমাম আবূ হানিফা (রা:) প্রাথমিক ও প্রয়োজনীয় দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করার পর ব্যবসার দিকে মনোনিবেশ করলেন। একদিন তিনি ব্যবসার কাজে বাজারে যাচ্ছিলেন। রাস্তায় ইমাম শা’বি (রা:) এর সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়। তিনি তাঁর চেহারায় অসাধারণ মেধা ও সৌভাগ্যের চিহ্ন দেখতে পান। তিনি তাঁকে ডাকলেন আর বললেন, “কোথায় যাচ্ছ?” ইমাম বললেন, “আমি বাজারে যাচ্ছি।” তিনি বললেন, “আলিমদের মজলিসে বস কারণ, আমি তোমার চেহারায় জ্ঞান ও গুণের চিহ্নাদির উজ্জ্বলতা দেখতে পাচ্ছি।”৪
এরপর ইমাম আ’যম (রা:) এর মনে শিক্ষার্জনের আগ্রহ সৃষ্টি হল। প্রথমে তিনি ‘ইলমে কালাম’ শিখতে আরম্ভ করলেন। এতে দক্ষতা অর্জন করে গোমরা ফির্কাগুলো- যেমন জাহমিয়া ও ক্বদরিয়া ফির্কার লোকদের সাথে তর্ক-মোনাযারা আরম্ভ করে দিলেন। এভাবে কিছুদিন এসব বাতিল ফির্কার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকেন এবং তাদের ভ্রান্তিগুলোকে লোকসমক্ষে আরো স্পষ্ট করে দিলেন।
পরবর্তীতে ফিকহ্‌ চর্চায় মনোনিবেশ করেন। হযরত হাম্মাদ (রা:) ছিলেন তৎকালীন একজন ফিকহ শাস্ত্রের গুরু, তিনি তাঁর মজলিশে প্রবেশ করেন। হযরত হাম্মাদ (রা:) ছিলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা:) এর মূলধারার শিষ্য। হযরত হাম্মাদ (রা:) জ্ঞান আহরণ করেছেন হযরত ইব্রাহীম নখয়ী (রা:) থেকে। যিনি ছিলেন হযরত আলকামা (রা:) এর যোগ্য উত্তরসূরী। হযরত হাম্মাদ (রা:) এর দরসে তিনি বিশেষ স্থান পেয়ে যান এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে ওস্তাদের চোখের মণি হয়ে যান। কিছুদিনের মধ্যে তিনি ওস্তাদের মর্যাদায় উন্নীত হন। ইত্যবসরে তিনি আলাদা দরসের মজলিস কায়েম করার মনস্থ করলেন। হযরত হাম্মাদ (রা:) কিছুদিনের জন্য কোথাও যাবেন তখন তিনি ইমাম আ’যম (রা:) কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে যান। তাঁর অনুপস্থিতিতে ইমাম আ’যম ৬০টা ফতওয়া জারি করেন। পরবর্তীতে হযরত হাম্মাদ (রা:) এর নিকট ফতওয়াগুলো পেশ করা হলে ৪০টি ফতওয়ার সাথে তিনি ঐক্যমত পোষণ করলেন। আর বাকি ২০টি মাসআলায় মুজতাহিদসূলভ বিরোধিতা করলেন। তখন ইমাম আ’যম শপথ করে নিলেন, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি হযরত হাম্মাদ (রা:) এর দরসের মজলিস ছাড়বেন না। তিনি তা পূর্ণও করেছিলেন।৫
১২০ হিজরীতে হযরত হাম্মাদ (রা:) ইন্তেকাল করলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এর নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বেই কূফার বিদ্যাপীঠ পরিচালিত হতে থাকে। যাকে তৎকালীন ফোকাহায়ে কেরাম “কিয়াসের প্রতিষ্ঠান” হিসেবে চিহ্নিত করেন। যুগশ্রেষ্ঠ আলেমগণ সেখানে হাজির হতে থাকেন। বসরা, মক্কা ও মদিনার আলেমগণও এ থেকে বাদ যাননি। আব্বাসীয় খলিফা আল মানসূর ক্ষমতায় এলে তাঁর এ বিদ্যাপিঠ বাগদাদে স্থানান্তরিত হয়। ওলামায়ে কেরাম তাঁর সাথে তর্ক-বিতর্ক ও গবেষণা করেন। তারা ইমাম আবূ হানিফা (রা:) থেকে জ্ঞান-পিপাসা নিবারণ করেন।
শিক্ষকবৃন্দ :-
আমাদের সমাজে লা-মাযহাবিরা বলে যে, ইমাম আ’যম আবূ হানিফা (রা:) মুহাদ্দিস ছিলেন না। অথচ তাঁর হাদিস শাস্ত্রে উস্তাদগণ ছিলেন প্রায় চার হাজার।
১. ইমাম আবূ আবদুল্লাহ ইবনে আবূ হাফস কবির ইমাম আবূ হানিফা ও ইমাম শাফেয়ীর শিষ্যদের মধ্যকার একটি তর্ক তুলে ধরে লিখেছেন, -(এক সময়) ইমাম শাফেয়ীর শিষ্যগণ ইমাম শাফেয়ীকে ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এর উপর মর্যাদা দিচ্ছিলেন, আবূ আবদুল্লাহ ইবনে আবূ হাফস হানাফী শাফেয়ীগণকে বলেন, “তোমরা ইমাম শাফেয়ীর শিক্ষকগণের গণনা করে বল তাদের সংখ্যা কত”? তাঁরা তখন গণনা করে বললেন, “আশিজন”। তখন হানাফিরা ইমাম আবূ হানিফার ওলামা ও তাবে’ঈ-শিক্ষক গণনা করলেন, তাঁদের সংখ্যা বের হল “চার হাজার”। তখন আবূ আবদুল্লাহ বলেন, “এটা ইমাম শাফেয়ীসহ অন্যান্য ইমামদের উপর ইমাম আবূ হানিফার সামান্য মর্যাদা”।৬
২. ইমাম ইবনে হাজার মক্কী (রহ:) ইমাম আ’যমের মাশায়েখের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এর অনেক শিক্ষক ছিলেন। ইমাম আবূ হাফস তাঁদের থেকে চার হাজার মাশায়েখের গণনা করেছেন। কেউ বলেন, শুধুমাত্র তাঁর তাবে’ঈ মাশায়েখের সংখ্যা চার হাজার।৭
ছাত্রবৃন্দ :-
ইমাম আ’যমের ছাত্রদের সংখ্যাও গণনার বাইরে। ইমাম আবূ ইয়ূসুফ, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে শায়বাহ্‌ এবং ইমাম যোফর হলেন তাঁর ওই শত গর্বের উপযোগী শাগরিদ, যাঁরা সমগ্র দুনিয়ায় হানাফী ফিক্বহ্‌কে প্রসারিত করেছেন। আর ইমাম আ’যমের শিক্ষাকে এভাবে প্রচার করেছেন যে, আজ বিশ্বে দুই’তৃতীয়াংশেরও বেশি মুসলমান হানাফী ফিক্বহ অনুসারে তাঁদের ইবাদত-বন্দেগী ও পার্থিব কার্যাদি সম্পন্ন করছেন। তা’ছাড়াও হাম্মাদ ইবনে নু’মান, ইবরাহিম ইবনে ত্বাহমান, হামযাহ ইবনে হাবিব, আবূ ইয়াহয়া হাম্মানী, আবূ নু’আইম ও আবূ আসেমের মত যুগবরেণ্য ফিক্বহবিদগণও ইমাম আ’যমের বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছাত্র ছিলেন।৮
আদর্শ চরিত্র :-
ইমাম আ’যম শুধু জ্ঞানে অদ্বিতীয় ছিলেন না, তিনি সুন্দর চরিত্রের দিক দিয়েও অনন্য ছিলেন। তাঁর নির্ভুল চিন্তাধারা ও জ্ঞানের প্রশস্ততা যেভাবে ক্বিয়ামত পর্যন্ত মানুষের একটি কর্মসূচি সরবরাহ করেছে, অনুরূপ তারঁ উন্নত এবং আর্দশ চরিত্রও মানুষের কর্মপদ্ধতিকে মহত্বের উপাদান দান করেছে। তাঁর আদর্শ চরিত্রের বিবরণ দিতে গিয়ে বড় বড় গ্রন্থ ও ইতিহাস রচিত হয়েছে। এ ক্ষুদ্র পরিসরে একটি মাত্র ঘটনা অবতারণা করার প্রয়াস পাচ্ছি। ইমাম যা’ফরানী লিখেছেন, একদা বাদশাহ্‌ হারূনুর রশীদ ইমাম আবূ ইয়ুসুফকে বললেন, “ইমাম আবূ হানিফার কিছু গুণ বর্ণনা করুন”। তিনি বললেন, “ইমাম আ’যম হারাম কার্যাদি থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতেন। জ্ঞানবিহীন দ্বীনি বিষয়ে কোন কথা বলতে খুবই ভয় করতেন। তিনি আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদতে চূড়ান্ত পযাের্য়র চেষ্টা করতেন। দুনিয়াবাসীদের সামনে কখনো তাদের প্রশংসা করতেন না। বেশির ভাগ সময় নিশ্চুপ থাকতেন। দ্বীনি মাসাইলের সমাধান নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতেন। এত বড় জ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত সাদাসিধে ও বিনয়ী ছিলেন। যখন তাঁকে কোন বিষয়ে প্রশ্ন করা হত, তখন তিনি কিতাব ও সুন্নাহ’র দিকে প্রত্যাবর্তন করতেন। যদি সেটার উদাহরণ ক্বোরআন ও হাদীসে না পেতেন, তাহলে ক্বিয়াস (অনুমান) করতেন। কারো নিকট থেকে কিছু পাওয়ার অভিলাষ তাঁর ছিল না। কারো সম্পর্কে আলোচনা করলে তার সদগুণাবলী নিয়েই আলোচনা করতেন।” এসব শুনে বাদশাহ্‌ হারূনুর রশীদ বললেন, “নেক্কার বুযুর্গদের চরিত্র এমনি হয়ে থাকে।” অতঃপর তিনি কেরানীকে বললেন “এ গুণগুলো লিখে নাও,” আর পুত্রকে বললেন, “এসব গুণাবলী মুখস্থ করে নাও।”৯
ইবাদত ও সাধনা :-
ইমাম আযম আবূ হানিফা (রা:) দীর্ঘ ৪০ বছর যাবৎ এশার নামাযের ওযূ দিয়ে ফজরের নামায সম্পন্ন করেছেন। ইমাম আবূ ইয়ূসুফ (রহ:) বলেছেন, ইমাম আযম (রা:) সারারাত জেগে ইবাদত করার বাহ্যিক কারণ এ ছিল যে, একদা এক ব্যক্তি তাঁকে দেখে বলল, “ইনি ওই ব্যক্তি, যিনি সারারাত ইবাদতের মধ্যে অতিবাহিত করেন”। ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এ কথা শুনে বলতে লাগলেন, “আমাকে মানুষের ধারণানূসারে গঠন করতে হবে”। এরপর থেকে তিনি সারারাত জেগে ইবাদত করতে লাগলেন। দীর্ঘ চল্লিশ বছর যাবৎ তাঁর এ নিয়ম অব্যাহত ছিল।১০
ইমাম আ’যমের (রা:)-এর ব্যাপারে অপপ্রচার :-
লা-মাযহাবি/আহলে হাদিস সম্প্রদায় ইমাম আ’যম (রা:) এর ব্যাপারে বিভিন্ন ধরণের অপপ্রচার চালাচ্ছে। তারা বলে- “আবূ হানিফা হাদিস জানতেন না। তিনি সহিহ হাদিস বাদ দিয়ে দুর্বল হাদিস বর্ণনা করতেন।” সেই কারণে তারা ইমাম আবূ হানিফা (রা:)-এর মাযহাব বাদ দিয়ে হাদিসের উপর আমল করতে শুরু করেছে। এবং তাদের মাযহাবের নাম দিয়েছে “লা-মাযহাবী”। বাংলা বুখারী পড়ে ওখানে তারা হাদিস পেয়েছে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম رفع اليدين করতেন, তাদের কথা “বুখারী শরীফে পাঁচটি হাদিস আছে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম رفع اليدين করেছেন এখন কার কথা মানব নবীজির কথা না ইমাম আবূ হানিফার কথা”। এ নিয়ে তারা কোঁমড় বেঁধে মাঠে নেমেছে। অথচ তারা যে বোকার স্বর্গে বাস করছে তার সামান্যতম খবরও তাদের নেই। বুখারী শরীফের মধ্যে আমরা যে পাঁচটি হাদীস দেখতে পাই যে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম رفع اليدين করেছেন, সেই বূখারী শরীফের হাদিসগুলোর পাশেই হাশীয়ায় স্পষ্ট ভাষায় লেখা–
واجابوا عن حديث الباب ونحوه بانه محمول على انه كان فى ابتداء الاسلام ثم نسخ والدليل عليه ان عبدالله بن الزبير رضى الله عنه راى رجلا يرفع يديه فى الصلوة عند الركوع وعند رفع رأسه من الركوع فقال لا تفعل بذاشئ فعله رسول الله صلى الله عليه وسلم ثم تركه ويويد النسخ ما رواه الطحاوى باسند صحيح حدثنا ابن ابى داود قال انا احمد بن عبد الله ابن يونس قال انا ابو بكربن عياش عن حصين عن مجاهد قال صليت خلف ابن عمر فلم يكن يرفع يديه الا فى التكبيرة الاولى من الصلوة-
অর্থাৎ: তরজুমাতুল বাব ও অন্যান্য জায়গায় বর্ণিত হাদিসের জবাব প্রদান করে ওলামায়ে কেরাম বলেন, উল্লেখিত হাদিস সমূহের উপর ইসলামের প্রথম যুগে আমল করা হত, পরবর্তীতে তার আমল রহিত হয়ে যায়। আমল রহিত হওয়ার দলিল হিসেবে উল্লেখ রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা:) তিনি এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন নামাযে রুকুতে যাওয়ার সময় ও উঠার সময় হাত উত্তোলন করতেছেন এটা দেখে তিনি নামাজী ব্যক্তিকে বললেন তুমি রুকুতে যাওয়ার সময় এবং উঠার সময় হাত উত্তোলন করিও না, কেননা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম দিকে এ আমল করলেও পরবর্তীতে তা বর্জন করেন। আর এই আমল রহিত হওয়ার দলীল ইমাম ত্বহাভী (রা:) সহিহ সূত্রে হযরত মুজাহিদ (রা:) হতে হাদিস বর্ণনা করে বলেন- আমি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) এর পিছনে নামাজ আদায় করেছি, তিনি ‘তাকবিরে ঊলা’ ব্যতীত কোন সময় হাত উত্তোলন (রফয়ে ইয়াদাইন) করেননি।১১
উপরুক্ত দলিল ছাড়াও رفع اليدين না করার ব্যাপারে আরো অনেকগুলো নির্ভরযোগ্য দলিল রয়েছে। ইমাম আ’যম আবূ হানিফা (রা:) رفع اليدين এর ব্যাপারে যে সমাধান দিয়েছেন এটাই সঠিক। তিনি নির্ভরযোগ্য দলিলের ভিত্তিতেই এই সমাধান দিয়েছেন।
সত্যিকার অর্থে কুরআন-হাদীস সম্পর্কে তাদের সঠিক জ্ঞান নেই। এবং ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এর জ্ঞান সম্পর্কেও তাদের কোন ধারণা নেই। ইমামে আ’যম আবূ হানিফা (রা:) যেভাবে প্রত্যেকটি বিষয়ের সমাধান দিয়েছেন আজ পর্যন্ত কেউ এত সুন্দর সমাধান দিতে পারেনি এবং উনার প্রদত্ত সমাধান আদৌ পর্যন্ত কেউ খন্ডাতে পারেনি।
ইমাম আওযায়ী (রা:) যিনি ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এর সমকালীন মুজতাহিদ ও মুহাদ্দিস ছিলেন তিনি একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রা:) কে বলেন- من هذا المبتدع الذى خرج بالكوفة فيكنى اباحنيفة”কূফায় গজিয়ে উঠা এই বেদাতীর পরিচয় কি? যাকে আবূ হানিফা উপনামে ডাকা হয়”?১২ ইমামে আ’যম আবূ হানিফা (রা:) এর প্রাণাধিক শিষ্য ইবনে মুবারক এ কথা শুনে চুপ থাকেন, এ সময় তিনি কিছু জটিল ও দুর্বোধ্য মাসআলা বর্ণনা করেন এবং সর্বজনগ্রাহ্য ফতোয়ার দিক নির্ণয় করেন। ইমাম আওযায়ী (রা:) বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে বলেন, কে দিয়েছে এই ফতোয়া? ইবনে মুবারক বলেন, ইরাকের জৈনিক শায়খ যার সাক্ষাতে এই মাসআলা ও ফতোয়া জেনেছি। ইমাম আওযায়ী (রা:) বলেন, যিনি এই ফতোয়া দিয়েছেন তিনি মাশায়েখকুল শিরমণি। যাও তার কাছে গিয়ে আরো দ্বীনি এলেম শিখ। ইবনে মুবারক বললেন- সেই শায়খের নাম আবূ হানিফা। পরবর্তীতে মক্কায় ইমামে আ’যম (রা:) এর সাথে ইমাম আওযায়ী (রা:) এর সাক্ষাৎ হয় এবং অনেক মাসআলা নিয়ে আলোচনা (তর্ক-বিতর্ক) হয়। অবশেষে ইমাম আওযায়ী (রা:) ইমাম আবূ হানিফা (রা:) সম্পর্কে বলেন-
غبطت الرجل بكثرة علمه ووفورعقله واستغفرالله تعالى لقد كنت فى غلط ظاهر والزم الرجل فانه بخلاف ما بلغنى عنه-
“লোকটার গভীর জ্ঞান ও অসামান্য বুদ্ধি বিবেকের প্রতি খামোখাই সমালোচনার তীর ছুড়েছি। এজন্য আল্লাহর কাছে পানাহ্‌ চাই। সত্যি বলতে কি আমি প্রকাশ্য ভুলের মাঝে ছিলাম। মহামানবের চরিত্রে এলজাম দিয়েছিলাম। লোকমুখে যা শুনেছি এর থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।”১৩
লোকমুখে শুনে ইমাম আওযায়ী (রা:) ইমাম আবূ হানিফা (রা:) সর্ম্পকে সঠিক ধারণা পোষণ করেননি। কিন্তু যখন ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এর গভীর জ্ঞানের কথা শুনলেন তখন তিনি তাকে মাশায়েখকুল শিরমণি বলেছেন। আর আজকে যারা ইমাম আবূ হানিফা (রা:) সর্ম্পকে মন্তব্য করার মত দু:সাহস করে তাদের অস্তিত্ব ঠিক আছে কিনা খবর নাই। অবস্থা দেখে মনে হয় তারা আধুনিক যুগের সংস্কারক।
তারা বলতে চায় ইমাম আ’যম হাদিস জানতেন না। তাদের সকলের জ্ঞান-চিন্তাভাবনা এক করলে যার এক ফুটা ঘামের সমান হবে না; তাঁর সম্পর্কে এমন মন্তব্য মুনাফিক ছাড়া কে করবে।
তিনি সেই ইমাম যিনি মাসআলাসমূহের উসূল বের করতেন। আর সেই উসূলের ভিত্তিতে আনুসঙ্গিক হাজারো মাসআলার উন্মেষ ঘটাতেন। শুধু তাই নয়, তিনি এমন ইমাম যিনি ঘটনা ঘটার আগে ঘটিতব্য বিষয়ের সমাধান বের করে রাখতেন।
ইমাম আ’যম (রা:) এর ফিক্বহশাস্ত্রের সংকলনে আইন-বিধি প্রণয়নের পদ্ধতি সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব বর্ণনাটি বিশেষ প্রনিধানযেগ্য। তিনি বলেন, আমি সর্বাগ্রে কুরআনের সুস্পষ্ট বিধির অনুসরণ করি; সেখানে যদি সুষ্ঠ কোন নির্দেশ না পাই, তবে প্রামাণ্য হাদিসের অনুসন্ধান করি; সেখানে যদি কিছু না পায়, তবে সাহাবিদের মধ্যে মতবেধের ক্ষেত্রে তাঁর যেই অভিমত অধিকতর যুক্তিযুক্ত ও সমিচীন বিবেচিত হয় আমি তা অনুসরণ করি। তাদের সকলের অভিমত পরিত্যাগ করে আমি নতুন কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি না। যদি তাঁদের কারও কোন অভিমত না পাওয়া যায়, শুধু সে ক্ষেত্রে ইমাম নখ’ঈ, ইমাম শা’বী, হাসান বসরী, ইবনে সীরিন, সাঈদ ইবনে মুসায়্যাব প্রমুখ তাবি’ঈর ন্যায় আমি ইজতেহাদ করি।১৪
আহলে হাদিসদের আরেকটি অপপ্রচার- তারা বলে আবূ হানিফা (রা:) হাদীস ছেড়ে দিয়ে কিয়াসের উপর আমল করেন। এটা সম্পূর্ণ বানোয়াট কথা। আসলে এরা এখন যেমন আছে ইমাম আ’যম (রা:)-এর সময়েও ছিল। যেমন : ইমাম আ’যমের (রা:) প্রসিদ্ধ শিষ্য আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক ইমাম আয’ম (রা:) ও ইমাম বাকের (রা:) এর সাথে সাক্ষাত লাভের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ইমাম আ’যম (রা:) হযরত ইমাম বাকের (রা:) এর সাথে মদিনা শরীফে সাক্ষাত লাভ করেন। ইমাম আ’যমের উপর অনেক ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি হাদিস ছেড়ে দিয়ে কিয়াসের উপর আমল করার অপবাদ দেন, তাই যখন সাক্ষাত হয় তখন ইমাম বাকের (রা:) ইমাম আ’যম আবূ হানিফা (রা:) থেকে জিজ্ঞেস করলেন,انت الذى خالفت أحاديث جدي صلى الله عليه وسلم بالقياس؟
-আপনি কি ঐ ব্যক্তি যে অনুমানের উপর আমার নানার হাদীসের বিরোধীতা করেন?
ইমাম আ’যম (রা:) বলেন, আল্লাহর পানাহ্‌! আপনি তাশরীফ রাখুন, আমি আপনাকে আরয করি, আপনার ইজ্জত ও হুরমাত আমাদের উপর এত জরুরী, যে রকম আপনার দাদার ইজ্জত রক্ষা সাহাবিদের উপর জরুরী ছিল। তখন ইমাম বাকের (রা:) তাশরীফ রাখলেন ইমাম আ’যমও তাঁর সামনে বসলেন এবং আরয করলেন, আমি আপনার থেকে তিনটি কথা জানতে চাই, আপনি তাঁর সমাধান দেবেন? প্রথম প্রশ্ন হল- “পুরুষ দুর্বল না মহিলা দুর্বল”? তিনি বললেন, “মহিলা”। অতঃপর ইমাম আবূ হানিফা (রা:) জিজ্ঞেস করলেন, “মহিলাদের মিরাসে কত অংশ”? তিনি বললেন, মহিলার অংশ পুরুষের অর্ধেক। এ উত্তর শুনে ইমাম আবূ হানিফা (রা:) বললেন, -এটা আপনার নানার ইরশাদ, যদি আমি কিয়াসের মাধ্যমে আপনার নানার কথাকে পরিবর্তন করতে চাইতাম তখন -”পুরুষকে এক অংশ দিতাম ও মহিলাকে ডাবল দিতে বলতাম”। কেননা, মহিলা পুরুষের চেয়ে দুর্বল।
অতঃপর ইমাম আ’যম (রা:) দ্বিতীয় প্রশ্ন তুলে ধরলেন, “নামায উত্তম, না রোযা”? ইমাম বাকের (রা:) বলেন, “নামায”। তখন আবূ হানিফা (রা:) বলেন, -এটা আপনার নানার ইরশাদ, যদি আমি কিয়াসের মাধ্যমে আপনার নানার দ্বীনকে পরিবর্তন করতে চাইতাম, মহিলা যখন হায়েয থেকে পবিত্রতা অর্জন করবে তখন যুক্তি দিয়ে বলতাম, “সে রোজা কাযা করার পরিবর্তে যেন নামায কাযা করে”। কারণ, রোযার চেয়ে নামায উত্তম।
অতঃপর ইমাম আ’যম (রা:) তৃতীয় প্রশ্ন করলেন, “পেশাব বেশী নাপাক, না বীর্য”? ইমাম বাকের (রা:) বলেন, “পেশাব”। তখন ইমাম আ’যম (রা:) বললেন, -”যদি আমি যুক্তি দিয়ে আপনার নানার কথা পরিবর্তন করতে চাইতাম, তখন আমি ফতওয়া দিতাম “পেশাব করলে গোসল করতে হবে এবং বীর্য বের হলে অযূ করতে হবে”। কেননা পেশাব বীর্য থেকে বেশী নাপাক। কিন্তু আমি আপনার নানার ধর্ম পরিবর্তন করা থেকে আল্লাহর আশ্রয় কামনা করছি”।
এ কথা শুনা মাত্র ইমাম বাকের (রা:) নিজ আসন থেকে উঠে আবূ হানিফার (রা:) এর সাথে আলিঙ্গন করলেন এবং কপালে চুমু খেলেন।১৫
এ বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, ইমাম আ’যম (রা:) এর কুরআন ও হাদিস অনুধাবন এবং দূরদর্শিতার বিপরীতে বিরোধীরা তাঁর বিরুদ্ধে এত অভিযোগ উত্তাপন করেছিল যে ইমাম বাকের (রা:) এর মত লোকও তাঁর ব্যাপারে সংকোচ প্রকাশ করেছেন। যখন ইমাম আ’যম (রা:) বিভিন্ন উপমার মাধ্যমে দূরদর্শিতা প্রকাশ করলেন তখন ইমাম বাকের (রা:) শুধু নিজ অভিযোগ প্রত্যাহার করেননি; বরং ইমাম আ’যম (রা:) এর জ্ঞানের গভিরতার স্বীকৃতি দিলেন। তার সমর্থনে নিম্নোক্ত র্বণনাও বিদ্যমান।
এক সময় ইমাম আ’যম (রা:) মক্কা মুকাররামায় ইমাম মুহাম্মদ বাকের (রা:) এর নিকট উপস্থিত হলেন তখন তিনি আবূ হানিফা (রা:) কে দেখে বলেন, আবূ হানিফা! আপনাকে দূরদৃষ্টি দিয়ে দেখতেছি- আপনি আমার নানার মুছে যাওয়া সুন্নাতকে জিবীত করবেন। আপনি প্রত্যেক দুঃখীকে সাহায্য করবেন এবং প্রত্যেক বিপদগ্রস্থের ডাকে সাড়া দিবেন। বিপদগ্রস্থলোক যখন নিরুপায় হবে তখন আপনার শরণাপন্ন হবে। আপনি পথহারা ব্যক্তিদেরকে পথের দিশা দিবেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সাহায্যপ্রাপ্ত হবেন। এমনকি আপনি রাস্তায় আল্লাহওয়ালাদের সাথে থাকবেন।১৬
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আওলাদ হযরত ইমাম বাকের (রা:) ইমাম আবূ হানিফা (রা:) সম্পর্কে এত সুন্দর বর্ণনা দিয়ে গেলেন। বললেন আপনি আমার নানার সুন্নাতকে জিবীত করবেন। অথচ আজকে লা-মাযহাবী সম্প্রদায় ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এর মাযহাব বাদ দিয়ে নিজেরা মনগড়া মাযহাব প্রতিষ্ঠিত করে সাধারণ মুসলমানকে বিভ্রান্ত করছে। সুতরাং এই নব্য ফেতনা লা-মাযহাবীদের থেকে আমাদেরকে অবশ্যয়ই দূরে থাকতে হবে। তাদেরকে সর্বাবস্থায় প্রতিহত করতে হবে।
লা-মাযহাবী সম্প্রদায় বুখারী বুখারী বলতে বলতে তাদের “বুখার”(জ্বর) এসে যায় অথচ, ইমাম বুখারী (রহ:) ইমাম আ’যম আবূ হানিফা (রা:) সম্পর্কে বলেন -”মুহাদ্দিসগণ তাঁর থেকে বর্ণনা করনে, তাঁর মতামত গ্রহণে ও তাঁর হাদীস গ্রহণ করনে নিশ্চুপ ছিলেন”।১৭
তাই সবশেষে একথাই বলা যায় যে, তিনি শুধু ফিক্বাহর ইমাম ছিলেন না; তিনি হাদিসেরও ইমাম ছিলেন। তিনি মুজতাহিদই নয় বরং তিনি ছিলেন একজন “তাবি’ঈ”।১৮
যে যুগকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম خير القرون বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ইমাম সা’দ তাঁকে ৫ম স্তরের অন্তরর্ভূক্ত বলেছেন। ইমাম আবূ হানিফা (রা:), আনাস ইবনে মালেক (রা:), আবদুল্লাহ ইবনে আবি আওফা (রা:), সাহল ইবনে সা’দ (রা:), আবুত-তুফাইল আমির ইবন ওযাদিলো (রা:) এর মত মহান সাহাবিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাত পেয়ে নিজেকে ধন্য করেছেন।১৯
আর আজকে আমরা এই যুগে এসে ইমাম আ’যমের ব্যাপারে মন্তব্য করছি একটুক্তি চিন্তা-গবেষণা করে দেখেছি আমি কে আর ইমাম আ’যম কে? আমি কার সমালোচনা করছি। কার ব্যাপারে বলছি তিনি হাদিস জানতেন না, কোন মাযহাবকে না মানার জন্য বলছি। যারা এই সমস্ত কথা বলে তাদের জ্ঞান, চিন্তা-ভাবনা যেখানে শেষ ইমাম আ’যম আবূ হানিফা (রা:) এর জ্ঞান, চিন্তা-ভাবনা সেখান থেকে শুরু।
সুতরাং ইমাম আবূ হানিফা (রা:) সম্পর্কে কোন মন্তব্য না করে এবং তাঁর প্রদত্ত মাসআলা তথা হানাফি মাযহাব অনুসারে নিজের জিবনকে বাস্তবায়ন করাই একজন আলেম ও প্রকৃত জ্ঞানীর কাজ। আল্লাহ পাক আমাদেরকে সহিহ বুঝ ও সে অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন।
আমীন! বিহুরমাতি সায়্যিদিল মুরসালিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
তথ্যসূত্র :
০১. খতিবে বাগদাদী : তারিখে বাগদাদ, ১৩/৩২৬; যাহাবী : সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ৬/৩৯৫।
০২. ইবনে হাজার হায়তামী : আল খায়রাতুল হিসান, পৃষ্ঠা : ৩১।
০৩. মুসলিম শরীফ : আস সহীহ, কিতাবু ফাযায়িলিস সাহাবা, باب فضل فارس ৪/১৯৭২, হাদিস : ২৫৪৬।
০৪. মানাক্বিবুল ইমামিল আ’যম আবী হানিফা, ১/৫৯।
০৫. মানাক্বিবুল ইমামিল আ’যম আবী হানিফা, ১/৫৬।
০৬. মুফেক : মানাক্বিবুল ইমামিল আ’যম আবী হানিফা, ১/৩৮; ইবনে বায্‌যায করদরী : মানাক্বিবুল ইমামিল আ’যম আবী হানিফা, ১/৬৮।
০৭. ইবনে হাজার মক্কী : আল খায়রাতুল হিসান, পৃষ্ঠা : ৩৬।
০৮. আসকালানী : তাহযিবুত্‌ তাহযীব ১/৪৪৯।
০৯. করদরী : মানাক্বিবুল ইমামিল আ’যম আবী হানিফা: ১/২২৬।
১০. আল খায়রাতুল হিসান, পৃষ্ঠা : ৮২।
১১. বুখারী : পৃষ্ঠা :১০২ হাশিয়া।
১২. আল মিযানুল কুবরা
১৩. আস সাহমূল মুসিব ফী তানিবিল খতিব।
১৪. আসকালানী : তাহযিবুত্‌ তাহযীব, ১/৪৫১; খতিবে বাগদাদী : তারিখে বাগদাদ, ১৩/৩৬৮; আল-ইনতিকা পৃষ্ঠা ১৪২-১৪৪; মানাক্বিবু ইমাম আবী হানিফা, ১/৮০-৮১।
১৫. মুফেক : মানাক্বিবুল ইমামিল আ’যম আবী হানিফা, ১/১৬৮; ইবনে হাজর মক্কী : আল খাইরাতুল হিসান, পৃষ্ঠা : ৭৬; আবূ যাহারা : আবূ হানিফা, পৃষ্ঠা : ৭১।
১৬. করদরী : মানাক্বিব-ই ইমাম-ই আ’যম, ১/৩১।
১৭. বুখারী : আত তারিখুল কবীর, ৮/৮১।
১৮. ইবনূন-নাদীম, পৃষ্ঠা : ১০১; ইসলামি বিশ্বকোষ : ইসলামি ফাউন্ডেশন, ২/৩৫৯।
১৯. ইসলামি বিশ্বকোষ : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২/৩৫৯।

Friday, June 7, 2013

৬ তাকবীরের সাথে ঈদের নামায আদায় করা হাদীস মোতাবেক সম্পূর্ণ সহীহ

৬ তাকবীরের সাথে ঈদের নামায আদায় করা হাদীস মোতাবেক সম্পূর্ণ সহীহ

 

সম্মানিত পাঠক/পাঠিকাবৃন্দ। এই ফাতওয়াটি একদল কথিত আহলে হাদীস কর্তৃক প্রকাশিত ঈদের নামাযের ৬ তাকবীর নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক একটি লিফলেটের জবাবে লিখা। ফাতওয়াটি তৈরী করেন ঐতিহ্যবাহী মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসার ইফতা বিভাগ। জামিয়াতুল আস’আদ আল ইসলামিয়ার ওয়েব সাইটের পাঠকদের জন্য ফাতওয়াটি প্রশ্নসহ প্রকাশ করা হল। আল্লাহ তায়ালা আমাদের কথিত আহলে হাদীসের ফিতনা থেকে হিফাযত করুন।
প্রশ্ন : (ক) ঈদের নামাজে ছয় তাকবীর ওয়াজিব। এর পক্ষে সহীহ কোন হাদীস আছে কি না?
থাকলে তার প্রমাণসহ জানতে চাই।
(খ) এক শ্রেণীর আলিম বলে থাকেন যে, “ঈদের নামাজে ছয় তাকবীর ওয়াজিব” একথাটা ভিত্তিহীন। সাথে সাথে তারা ঈদের নামাজে বার তাকবীরের পক্ষে বেশ কিছু হাদীসও ওলামায়ে কেরামের আমল পেশ করে থাকেন। যেমন-তাদের কিছু বক্তব্য প্রশ্নের সাথে সংযোজন করা হল। এর জবাব কি? বিস্তারিত জানতে চাই।
ঈদের নামাযের অতিরিক্ত তাকবীর সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান:
(ক) দু’ঈদের নমাযে অতিরিক্ত ৬ তাকবীর ওয়াজিব হওয়ার বিধান সম্পূর্ণ হাদীস সম্মত। মারফু এবং মাওকুফ উভয় প্রকারের হাদীস দ্বারা তা প্রমাণিত। এ ব্যাপারে সহীহ-শুদ্ধ হাদীস গ্রন্থাদিতে বহু হাদীস পাওয়া যায়। উদাহরণ স্বরূপ কয়েকটি হাদীস নিম্নে পেশ করছি।
১নং হাদীস:
أن القاسم ابا عبد الرحمن حدثه قال حدثني بعض اصحاب رسول الله صلي الله عليه وسلم قال صلي بنا النبي صلي الله عليه وسلم يوم عيد فكبر اربعاً واربعاً ثم اقبل علينا بوجهه حين انصرف فقال لا تنسوا كتكبير الجنائز واشار باصابعه وقبض ابهامه ـ فهذا حديث حسن الاسناد ـ
নির্ভরযোগ্য হাদীসগ্রন্থ তাহাবী শরীফের বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে যে, আবু আব্দুর রহমান বলেন, আমাকে কতিপয় সাহাবা রাযি. বলেছেন যে, হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের নিয়ে ঈদের নামায পড়ে ছিলেন। তাতে তিনি চার চার তাকবীর বলেন। অত:পর নামায শেষে হুযুর (সা.) আমাদের কে লক্ষ্য করে বললেন, ভুলে যেও না, ঈদের নামাযের তাকবীর জানাযার নামাযের তাকবীরের অনুরূপ। সাথে সাথে হুযুর (সা.) বৃদ্ধাঙ্গুলী মুষ্ঠিবদ্ধ করে অবশিষ্ট চার আঙ্গুল দ্বারা ইঙ্গিত করে দেখালেন (তাহাবী শরীফ, ২/৪০০পৃ । বর্ণিত হাদীসের সনদকে ইমাম তাহাবী রহ. হাসান বলেছেন। আর হাসান হাদীস গ্রহণযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে সহীহ হাদীসের মত (তাদরীবুর রাবী, ১/৯৬ পৃ । বর্ণিত হাদীসে দু’ রাকাতে চার চার তাকবীর বলা হয়েছে। এদ্বারা বুঝা যায় মোট আট তাকবীর। যথা: প্রথম রাকাতে তাকবীরে তাহরীমা সহ চার তাকবীর আর দ্বিতীয় রাকাতে রুকুর তাকবীর সহ চার তাকবীর। অর্থাৎ দুটি আসল ৬টি অতিরিক্ত বলা যেতে পারে।
২নং হাদীস:
أن سعيد بن العاص سأل أبا موسي الاشعري وحذيفة بن اليمان كيف كان رسول الله صلي الله عليه وسلم يكبر في الاضحي والفطر فقال ابو موسي كان يكبر اربعا تكبيرة علي الجنائز فقال حذيفة صدق فقال ابو موسي كذلك كنت اكبر في البصرة ـ
বিশুদ্ধ হাদীসগ্রন্থ আবু দাউদ শরীফের এ হাদীসে বলা হয়েছে যে, সাঈদ ইবনে আস রাযি. একদা আবু মূসা আশয়ারী ও হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান রাযি. কে জিজ্ঞাসা করলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার নামাযে কিভাবে তাকবীর বলতেন? জবাবে আবু মূসা রাযি. বললেন জানাযার নামাযের মত প্রতি রাকাতে চার চার তাকবীর বলতেন। হুযায়ফা রাযি. সমর্থন করে বললেন আবু মূসা সত্য বলেছে। আবু মূসা রাযি. বললেন আমিও বসরা দেশে এভাবেই তাকবীর বলতাম (আবু দাউদ, ১/১৬৩ পৃ:; মুছান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, ৪/২১৩ পৃ ।

উভয় হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদের নামাযের তাকবীর প্রতি রাকাতে চার চার করে সর্ব মোট আট বলেছেন। অর্থাৎ দু’টি আসল ৬টি অতিরিক্ত। প্রশ্ন হতে পারে, হাদীসে তো তাকবীরে তাহরীমা ও রুকুর তাকবীরের কথা উল্লেখ নেই? তার জবাবে বলতে চাই যে, হুযুর (সা.) ঈদের তাকবীরকে জানাযার তাকবীরের সাথে তুলনা করেছেন। তা থেকে বুঝা যায় যে, যেমন জানাযার ৪ তাকবীরের মধ্যে প্রথম তাকবীরে তাহরীমা অপর ৩টি অতিরিক্ত তদ্রুপ ঈদের নামারের চার চার তাকবীরের মধ্যে ও একটি আসল অপর ৩টি অতিরিক্ত। এটা কোন মনগড়া ব্যাখ্যা নয় বরং বহু মাওকুফ হাদীস দ্বারা প্রমানিত সত্য। একথা বলার আর অপেক্ষা রাখে না যে, হাদীসে মাওকুফ যদি ইজতেহাদী বিষয় না হয় এবং কুরআনের কোন আয়াত বা হাদীসে মারফুর সাথে সাংঘর্ষিক না হয় তখন হাদীসে মারফুর মত শরীয়তের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ যোগ্য হবে (জফরুল আমানী, ১/১৯০ পৃ ।
২নং হাদীসের সনদের তাহকীক: বার তাকবীর সমার্থকগণ আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত হাদীসের সনদকে যয়ীফ বলতে চায়। কারণ উক্ত সনদে একজন রাবী হলেন আবু আয়শা তিনি মাজহুল। তাদের এই দাবী সঠিক নয়, কারণ আবু আয়শা হতে দু’ জন বর্ণনাকারী পাওয়া যায় একজন মাকহুল দ্বিতীয়জন খালিদ ইবনে মা’দান (তাহযীবুত তাহযীব, ১২/১৪৬ পৃ । আর রিজাল শান্ত্রের উসূল হল, যে রাবীর দু’জন ছেকাহ ছাত্র থাকবে সে কখনে মাজহুল থাকে না (মুকাদ্দামায়ে ইবনে সালাহ, ৯০ পৃ:; তাদরীবুর বাবী, ১/২২০ পৃ । হাফেজ আসকালানী রহ. আবু আয়শা কে মাকবুল বলেছেন, অতএব তার হাদীস গ্রহণযোগ্য হবে (তাকরীবুত তাহযীব, ১/৪২৬ পৃ ।
সাহাবাদের আমল
এ ছিল ৬ তাকবীরের সাথে ঈদের নামাযের সমর্থনে মারফু হাদীসের আলোচনা। এবার দেখা যাক, ৬ তাকবীরের সাথে ঈদের নামাযের প্রসঙ্গে হাদীসে মাওকুফ বা সাহাবায়ে কেরামের আমল কি ছিল?
أن إبن مسعود رضـ كان يكبر في العيدين تسعا اربع قبل القرأة ثم يكبر فيركع وفي الثانية يقرأ فاذا فرغ كبر اربعاً ثم ركع ـ
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি.) থেকে ঈদের নামাযের নিয়ম প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে যে, তিনি ঈদের নামাযে ৯টি তাকবীর বলতেন। ৪টি কেরাতের পূর্বে। অর্থাৎ তাকবীরে তাহরীমা সহ ৪টি। অত:পর কেরাত পড়ে তাকবীর বলে রুকু করতেন। দ্বিতীয় রাকাতে কেরাতের পর ৪টি তাকবীর বলতেন এবং চতুর্থ তাকবীরের সাথে রুকু করতেন (তিরমিজী শরীফ, ১/১২০ পৃ:; ই’লাউস সুনান, ৮/১০৬ পৃ:; তাহাবী শরীফ, রায়াহ, ২/৪০১ পৃ: মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, ৪/২১৬পৃ. নাসবুর রায়াহ, ২/২২২ পৃ.)।
আল্লামা হাফেজ ইবনে হাযম জাহেরী (রহ.) এ হাদীসটি উল্লেখ করে বলেন যে, এটি অতীব সঠিক এবং এটিই ইমাম আবু হানিফা রহ. এর অভিমত (আল-মুহাল্লা, ৫/৮৩ পৃ ।
অনুরূপ হাফেজে হাদীস আল্লামা ইবনে হাযার আসকালানী রহ. বলেন যে, এ হাদিসটি হাফেজ আব্দুর রাজ্জাক সহীহ সনদে বর্ননা করেছেন (আদদিরায়াহ, ১/ ১৭৩ পৃ ।
ছয় তাকবীরের সাথে ঈদের নামাযের এই নিয়মটি হযরত ইবনে মাসউদ ব্যতীত হযরত ওমর, হুযায়ফ, আবু মূসা আশয়ারী, আনাস, জাবির, আবু মাসউদ আনসারী, ইবনে আব্বাস ও আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রাযি.) প্রমুখ সাহাবায়ে কেরাম থেকেও বর্ণিত আছে (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, ৪/২১৪-২১৯ পৃ:; তাহাবী শরীফ, ২/৪০০ পৃ ।
সার কথা উপরের বর্ণনা দ্বারা স্পষ্ট বুঝা গেল যে, ঈদের নামায তাকবীরাতে জাওয়ায়েদে ছিত্তা অর্থাৎ অতিরিক্ত ছয় তাকবীরের সাথে আদায় করা নির্ভরযোগ্য ও সহীহ হাদীস সম্মত এবং অনেক সাহাবায়ে কেরামের স্বতঃসিদ্ধ আমলও তা। সুতরাং ঈদের নামাযের প্রচলিত নিয়ম অর্থাৎ ছয় তাকবীরে আদায় করাকে হাদীসের পরিপন্থী বা বিদআত বলার কোন অবকাশ নেই।
পূর্বেও বলা হয়েছে যে,সাহাবাদের আমল সহীহ হাদীসের বিপরীত না হলে তা নির্দ্বিধায় গ্রহণযোগ্য। বিশেষ করে খোলাফায়ে রাশেদ হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. ও হযরত ইবনে মাসউদ রাযি. এর মত হাদীস বিশেষজ্ঞ সাহাবীদের আমল হলে তা দলীল হওয়াতে মোটেই দ্বিধা সংশয় না হওয়া চাই। বলা যেতে পারে যে, এখানে হাদীস সাহাবাদের আমল ১২ তাকবীরের পরিপন্থী? তার উত্তরে বলবো যে,সেই হাদীস গুলো দূর্বল প্রকৃতির। আর দূর্বল হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লামা হাফেজ ইবনে হাযম যাহেরী বলেন, ১২ তাকবীরের হাদীসগুলো মোটেই গ্রহণযোগ্য নয় (আল মুহাল্লা, ৫/৮৪)।
অনুরূপ হাফিজে হাদীস ইমাম তাহাবী রহ. তাহাবী শরীফের ২/৩৯৯ পৃষ্ঠায় বলেন যে, বিরুদ্ধপক্ষের হাদীস অর্থাৎ ১২ তাকবীরের হাদীস গুলো যয়ীফ হওয়ার কারণে অপ্রমাণযোগ্য। একথার বাস্তব প্রমাণ হিসেবে নিুম্নে ১২ তাকবীরের সমর্থনকারীদের উপস্থাপিত কিছু হাদীসের তাহকীক পেশ করছি। যে হাদীসগুলি তারা সরলমনা মুসলমানদের কে ধোকা দেওয়ার অপমানসে লিফলেট আকারে প্রকাশ করে চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করছে।

(খ) লিফলেটে প্রচারিত ১২ তাকবীরের হাদীসের তাহকীক:
১নং হাদীস: قال الشافعي سمعت سفيان بن عيينة يقول سمعت عطاء بن ابي رباح يقول سمعت عبد الله بن عباس يقول اشهد علي رسول الله صلي الله عليه وسلم انه كبر في صلاة العيدين في الاولي سبعا سوي تكبيرة الاحرام وفي الثانية خمسا سوي تكبيرة القيام ـ
হাদীসটি উল্লেখ করে বলা হয়েছে এ হাদীসের সনদ অধিক ছহীহ এবং রাবীগণ অধিক নির্ভরযোগ্য এবং অধিক প্রতিষ্ঠিত শব্দে বর্ণিত কেননা এ হাদীস সামিতু (আমি নিজে শুনেছি) শব্দ দ্বারা এসেছে। (কিতাবুল উম্ম ১ম খন্ড ২৩৬ পৃ
তাহকীক: অত্যন্ত দু:খ জনক বিষয় হল এখানে কিতাবুল উম্ম এর উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ উল্লিখিত সনদের কোন হাদীস কিতাবুল উমে নেই। শুধু তাই নয় ছহীহ হাদীসের যত কিতাব রয়েছে কোন একটি কিতাবে এমন সনদে বর্ণিত হাদীস দেখাতে পারবেন না। কিতাবুল উমের উদ্বৃতি দিয়ে মাওলানা সাহেব সাধারণ মানুষকে ধোকা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। কিতাবুল উমে ঈদের তাকবীর সংক্রান্ত যে সকল হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে তার কোন একটি হাদীস আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত নয়।
দ্বিতীয়ত: সনদের দিকে দেখলেও বুঝে আসে যে, সনদটি সম্পূর্ণ বানানো। কারণ সুফিয়ান বিন উয়াইনা আতা বিন আবি রাবাহ এর ছাত্র নন। রিজাল শাস্ত্রের কোন কিতাবে ছাত্র হিসেবে উল্লেখ করেননি। আর ছাত্র হওয়ার সম্ভাবনাও খুব কম। কারণ সুফিয়ান বিন উয়াইনার জন্ম ১০৭ আর আতা বিন আবি রাবাহ এর মৃত্যু ১১৪ হিজরী। অতএব এত অল্প সময়ে মক্কার এক উস্তাদের কুফি এক ব্যক্তি ছাত্র হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।
২নং হাদীস:عن كثير بن عبد الله عن ابيه عن جده أن النبي صلي الله عليه وسلم كبر في العيدين في الاولي سبعاً قبل
القرأة وفي الاخرة خمساً قبل القرأة ـ
ঈদের নামাযের তাকবীরে জাওয়ায়েদ ১২টি হওয়ার পক্ষে বর্ণিত হাদীসকেই মূল হাদীস হিসেবে পেশ করা হয়। তবে হাদীসটির সনদ অত্যন্ত দূর্বল বা যয়ীফ। কারণ সনদে এক রাবী হলেন কাসীর বিন আব্দুল্লাহ তার সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, هو ركن من اركان الكذب অর্থাৎ কাসীর বিন আব্দুল্লাহ মিথ্যুকদের অন্যতম। ইবনে হিব্বান বলেন يروي عن ابيه عن جده نسخة موضوعة لا يحل ذكره في الكتب অর্থাৎ কাসীর বিন আব্দুল্লাহ তার পিতা এবং তার পিতা তার দাদা থেকে যে সনদ বর্ননা করে এটি একটি মওজু তথা বানাওয়াট সনদ। এমন সনদ কোন হাদীসের কিতাবে উল্লেখ করা অনুচিৎ (তোহফাতুল আহওয়াজী, ৩/৬৫ পৃ:; তাওযীহুল আফকার, ১/১৬৯ ইমাম বুখারী রহ. বালেন, منكر الحديث অর্থাৎ কাসীর বিন আব্দুল্লাহ এর হাদীস অপ্রমাণযোগ্য। ইমাম নাসায়ী বলেন متروك অর্থাৎ পরিত্যক্ত (তাহযীবুত তাহযীব, ৮/৪১৭; আল-কামেল ফিজ-জোয়াফা, ৭/২০০ পৃ ।
উল্লিখিত হাদীসটি সম্পর্কে ইমাম তিরমিজী বলেন, আমি হাদীসটি সম্পর্কে ইমাম বুখারীর রহ. কাছে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, এটাই ঈদের তাকবীর সম্পর্কে সর্বোচ্চ সহীহ হাদীস (তোহফাতুল আহওয়াযী, ৩/৬৬ পৃ ।
উপরের আলোচনাকে মিলালে সর্ব সাধারণের আর বুঝতে বাকী থাকবে না যে, একজন মিথ্যুক রাবীর হাদীস যদি সর্বোচ্চ হয়। তাহলে ১২ তাকবীর সংক্রান্ত বাকী হাদীসগুলির গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু?
৩, ৯ ও ১১ নং হাদীস: ৩নং হাদীসে হযরত আবু হুরাইরা রাযি. ৯নং হাদীসে হযরত আলী রাযি. ও ১১নং হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. এর আমল বর্ণনা করা হয়েছে। আমরা ইতঃপূর্বে বার বার বলেছি, হাদীসে মাওকুফ তথা সাহাবাদের আমল দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য শর্ত হল হাদীসে মারফু সহীহর খেলাফ না হওয়া। আর বর্ণিত হাদীসগুলো ৬ তাকবীরের হাদীসে মারফু সহীহর খেলাফ। অতএব এমন হাদীসে মাওকুফ আমলযোগ্য নয়। এখানে এমন প্রশ্ন করা অবান্তর যে, বার তাকবীরের পক্ষেও তো হাদীস পাওয়া যায়। কারণ পূর্বের আলোচনা প্রমাণ করেছে যে, ১২ তাকবীরের সমস্ত হাদীস যয়ীফ হওয়ার কারণে অগ্রহণযোগ্য।
৪ নং হাদীস ঃ عن عمر بن الخطاب انه صلي العيد فكبر في الاولي سبعاً وفي الثانية خمساً يرفع يديه مع كل تكبير
ـ البيهقي ص ৩/৪১২
এখানেও মাওলানা সাহেব ওমর রাযি. এর আমল বয়ান করার ক্ষেত্রে বায়হাকী শরীফের উদ্বৃতি দিয়ে অসত্যের আশ্রয় নিয়েছেন। কারণ এমন হাদীস বায়হাকী শরীফে নেই (বায়হাকী শরীফ, ৫/৬৬-৭০ পৃ. দ্রষ্টব্য)
আর তাহাবী শরীফের একটি লম্বা হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ওমর রাযি. এর যুগে ঈদের নামাযে অতিরিক্ত তাকবীর ৬টি হওয়ার উপর ইজমা সংগঠিত হয়েছে (তাহাবী শরীফ, ১/২৮৬ পৃ.)।
৪নং হাদীসের জবাবে ঐ আলোচনা ও প্রযোজ্য হবে যা ৩নং হাদীসে বলা হয়েছে।
৫ ও ৮ নং হাদীস ঃ حدثنا ابو سعيد مولي بني هاشم حدثنا ابن لهيعة عن عقيل عن ابن شهاب عن عروة عن
عائشة ان رسول الله صلي الله عليه وسلم ……. الحديث .
হাদীসটি যয়ীফ, কারণ হাদীসটির সনদে একজন রাবী হলেন আব্দুল্লাহ বিন লাহীয়া। আর আব্দুল্লাহ বিন লাহীয়া সম্পর্কে অধিকাংশ মুহাদ্দিসীন বলেছেন তিনি যয়ীফ। ইমাম তিরমিজী রহ. বলেন لا يحتج به অর্থাৎ ইবনে লাহীয়ার হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করা যাবে না (তিরমিজী, ২য় খন্ড, কিতাবুল ইলাল, ২৩৫ পৃ.)।
ইমাম নাসায়ী বলেন, তিনি যয়ীফ (মিজানুল ইতিদাল, ৪/১৬৬ পৃ.)। আল্লামা শাওকানী বলেন, ইবনে লাহীয়া যয়ীফ (নাইলুল আওতার, ৩/৩১২ পৃ.)।
ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন বলেন, ইবনে লাহীয়া ـ ضعيف الحديث ـ হাদীস বর্ণনায় দুর্বল। তার হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করা যাবে না। আলী ইবনে মাদীনি বলেন, আমি ইয়াহইয়া বিন সাঈদকে বলতে শুনেছি আমাকে বিশির ইবনে ছারী বলেছেন-لو رأيت ابن لهيعة لم تحمل عنه حرفاً অর্থাৎ তুমি যদি ইবনে লাহীয়াকে দেখতে তার থেকে একটি হরফও গ্রহণ করতে না। ইয়াহইয়া বিন মায়ীনকে বলা হল যে, ইবনে লাহীয়ার কিতাব পুড়ে গিয়েছিল। ইয়াহইয়া জবাবে বলেন, সে কিতাব পোড়ার আগের থেকে যয়ীফ। ইমাম সা’দী বলেন, ইবনে লাহীয়ার হাদীস শিক্ষা করা, তার হাদীস থেকে দলীল পেশ করা, তার হাদীস হিসেবে গণনা করা কোনটাই ঠিক না (আল-কামেল ফিয-যোয়াফা ৫/২৩৭-২৩৯ পৃ.)।
৬ নং হাদীস ঃ حدثنا مسدد حدثنا المعتمر قال سمعت عبد الله بن عبد الرحمن الطائفي يحدث عن عمرو بن شعيب عن ابيه عن عبد الله بن عمرو بن العاص قال قال نبي الله صلي الله عليه وسلم التكبير في الفطر سبع ………….
ابو داؤد . ১/১৬৩
বর্ণিত হাদীসে এক রাবী পাওয়া যায়, আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান তায়েফী তিনি বিতর্কিত রাবী। ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন একবার বলেছেন صويلح আবার বলেছেন যয়ীফ। ইমাম বুখারী রহ. বলেন, فيه نظر অর্থাৎ তার ব্যাপারে সমস্যা আছে। ইমাম নাসায়ী বলেন সে মজবুত রাবী নয়। আলী ইবনে মাদীনি ও ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীনের ন্যায় মত ব্যক্ত করেছেন (মিজানুল ই’তিদাল, ৪/১৩৪ পৃ.; তাহযীবুত তাহযীব, ৫/২৯৮ পৃ.; একমালু তাহযীবিল কামাল, ৮/৩৬; আল কামেল ফিয যোয়াফা, ৫/২৭৫ পৃ.)।
৭নং হাদীস ঃ
حدثنا عبد الله حدثني سريح بن يونس حدثنا محبوب بن محرز بياع القوارير عن ابرايهم بن عبد الله بن فروخ عن ابيه قال صليت خلف عثمان العيد فكبر سبعا و خمساً.
মুসনাদে আহমদের বর্ণিত হাদীসের টিকায় বলা হয়েছে, হাদীসটি নিতান্ত যয়ীফ, কারণ এর সনদে মাহবুব ইবনে মুহরিজ একজন রাবী রয়েছে যিনি যয়ীফ। তদরুপ আর এক রাবী হলেন ইব্রাহীম ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে ফররুখ তিনি মাজহুল। মাহবুব ইবনে মুহরিজ সম্পর্কে ইমাম দারা কুতনী বলেন, তিনি যয়ীফ (মিজানুল ই’তিদাল, ৬/২৮ পৃ ।
১০ নং হাদীস ঃ حدثنا عثمان بن احمد الدقاق حدثنا احمد بن علي الخزار حدثنا سعد بن عبد الحميد حدثنا فرج بن فضالة عن يحي بن سعيد عن نافع عن ابن عمر قال قال رسول الله صلي الله عليه وسلم التكبير في العيدين في
الركعة الاولي سبع تكبيرات وفي الأخرة خمس تكبيرات ـ
সুনানে দারা কুতনীর টিকায় বলা হয়েছে হাদীসটি যয়ীফ। কারণ ফরজ ইবনে ফুজালা ذاهب الحديث অর্থাৎ যয়ীফ। ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. বলেন منكر الحديث ইমাম নাসায়ী বলেন যয়ীফ। ইবনে যারীন বলেছেন তিনি যয়ীফ। এছাড়া আরও অনেকে যয়ীফ বলেছেন (দারা কুতনী, ২/৩৮৮ পৃ; তাকরীবুত তাহযীব ২/৮ পৃ. তাহযীবুত তাহযীব, ৮/২৬০ পৃ.)।
১২ নং হাদীস ঃ حدثنا هشام بن عمار حدثنا عبد الرحمن بن سعد بن عمار بن سعد مؤذن رسول الله صلي الله عليه وسلم حدثني ابي عن ابيه عن جده ان رسول الله صلي الله عليه وسلم كبر في العيدين سبعاً في الاولي وخمسا في
الاخرة ـ
ইবনে মাজা শরীফের টিকায় বলা হয়েছে হাদীসটির সনদ যয়ীফ কারণ সনদে একজন রাবী হলেন আব্দুর রহমান বিন সামাদ তিনি যয়ীফ। ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন তাকে যয়ীফ বলেছেন (সুনানে ইবনে মাজা, ২/১০২ পৃ.; তাহযীবুত তাহযীব, ৬/১৮৩ পৃ.; তাহযীবুল কামাল, ৬/১৪৫ পৃ.; খুলাসাতু তাহযীবিল কামাল, ২/১৬৩ পৃ.)।
১৩ নং হাদীস ঃ عبد الرزاق عن ابي يحي عن جعفر بن محمد عن ابيه قال كان علي يكبر في الفطر والاضحي
والاستسقاء سبعا في الاولي ………… الحديث
হাদীসটি নিয়ে গবেষণা করলে দেখা যায় যে, মুহাদ্দিস মুহাম্মদ রহ. প্রথমে হযরত আলী রাযি. এর আমল বর্ণনা করেছেন এরপর রাসূলুল্লাহ (স.) সহ আরো কিছু সাহাবাদের আমল বর্ণনা করেছেন। অথচ মুহাদ্দিস মুহাম্মদ রহ. আলী রাযি. সহ হাদীসে বর্ণিত সাহাবাদের কাউকেও দেখেননি। ফলে সনদের মধ্যে এনকেতা পাওয়া গেছে। আর সনদে এনকেতা পাওয়া গেলে হাদীস মুনকাতে হয়। মুনকাতে হাদীস যয়ীফ এবং অপ্রমাণযোগ্য হয়।

৬ তাকবীরের হাদীসের গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য আরোপিত শর্তের জবাবঃ
১. লিফলেটে বলা হয়েছে, যে সকল হাদীসের সনদে হাদীস শাস্ত্রের ইমাদের কোন একজন আপত্তিজনক মন্তব্য করেছেন এমন কোন হাদীস দয়া করে পাঠাবেন না। এর জবাবে বলবো উপরের আলোচনার দ্বারা সর্ব সাধারণের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা ১২ তাকবীরের পক্ষে যতগুলি হাদীস পেশ করেছে প্রত্যেকটি হাদীসের সনদে ইমামুল হাদীসগণ শুধু আপত্তি করেছেন তাই নয় বরং প্রত্যেকটি হাদীস যয়ীফ ও অপ্রমাণযোগ্য প্রমাণিত হয়েছে। অতএব ৬ তাকবীরের হাদীসের জন্য এমন শর্ত আরোপ করার যৌক্তিকতা কি?
২. কোন সাহাবীর আমল ছয় তাকবীরের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হবে না বলা হয়েছে। অথচ তারা ১২ তাকবীরের পক্ষে ১৩টি হাদীস পেশ করেছে তার মধ্যে ৬টি হাদীস সাহাবাদের আমল সম্বলিত।
৩. তাকবীরাতে ঈদাইন অর্থাৎ ঈদের নামাযের অতিরিক্ত ৬ তাকবীর প্রমাণিত হওয়ার জন্য হাদীসে সরাসরি ৬ শব্দটি উল্লেখ থাকতে হবে এমন কথা বলা, আমি মনে করি নির্বুদ্ধিতার প্রমাণ। কারণ অনেক হাদীসে দেখা যায় শরীয়তের কোন একটি বিধান বর্ণনা করতে গিয়ে একটি সংখ্যা বলা হয়েছে অথচ ঐ বিধানের ক্ষেত্রে ঐ সংখ্যাই নির্ধারণ করা হয় না। যেমন বিতিরের নামাযের রাকাতের ব্যাপারে হাদীসে ১৩, ১৫, ১৭ পর্যন্ত সংখ্যা পাওয়া যায় অথচ বিতিরের নামাজ ১৩, ১৫, বা ১৭ রাকাত এমন কেহ বলেননি (তিরমিজী শরীফ ১/১০৩ পৃ.) ।
অতএব বুঝা গেল ঈদের তাকবীর ৬টি প্রমাণ হওয়ার জন্য ৬ শব্দ হাদীসে সরাসরি উল্লেখ পেতে চাওয়া অবান্তর। ৮ বা ৯ সংখ্যা দ্বারাও ৬ তাকবীর প্রমাণ হতে পারে। ৮ থেকে যে ২ বিয়োগ হলে ৬ হয় এ অংক যারা বুঝে না তাদের সাথে কিসের আলোচনা।

ইবনে মাসউদ রাযি. এর হাদীসের উপর আপত্তির জবাব:
লিফলেটে বলা হয়েছ হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাযি.) এর হাদীস কে যদি দলীল হিসেবে গ্রহণ করা হয় তাহলে সুরা নাস ও ফালাককে কুরআন শরীফ থেকে বাদ দিতে হবে, কারণ এ দ’ুটি সুরাকে ইবনে মাসউদ রাযি. কুরআনের অংশ মনে করেন না। এক্ষেত্রে তাফসীরে ইবনে কাসীর ও তাফসীরে রুহুল মাআনী সহ কয়েকটি তাফসীরের কিতাবের উদ্বৃতি পেশ করা হয়েছে। প্রথমত: আমরা পূর্বেই বলেছি সাহাবাদের উক্তি যদি হাদীসে মারফুর বিপরীত না হয় তখন দলীল হিসেবে গ্রহণ করা হবে। অতএব এক্ষেত্রে যেহেতু ইবনে মাসউদ রাযি. এর উক্তি ইজমায়ে সাহাবার বিপরীত অতএব সূরা নাস ও ফালাক কুরআনের অংশ হওয়ার ব্যাপারে ইবনে মাসউদ (রাযি.) এর মত দলীল হওয়ার প্রশ্নই আসে না। দ্বিতীয়ত: মাওলানা সাহেব স্বার্থ হাসীলের জন্য শুধু لا تقربوا الصلاة ই দেখেছেন وأنتم سكري আর দেখেননি। অর্থাৎ তিনি শুধু তাফসীরে ইবনে কাসীর ও তাফসীরে রুহুল মাআনীতে এটাই দেখেছেন যে, ইবনে মাসউদ (রাযি.) সূরা নাস ও ফালাককে কুরআনের অংশ মনে করেন না। তিনি ইহা আর দেখলেন না যে, তার পরে বলা হয়েছে ইবনে মাসউদ রাযি. এর নিকট সহীহ সনদে প্রথমে সূরা নাস ও ফালাক না পৌঁছার কারণে এমন উক্তি ব্যক্ত করেছেন। অতএব যখন সহীহ সনদে জানতে পারলেন যে, সুরা নাস ও ফালাক ও কুরআনের অংশ তখন প্রথম উক্তি থেকে ফিরে এসে জমহুরে সাহাবাদের মত গ্রহণ করেছেন। অতএব এখন আর কোন সংশয় বাকী রইল না (তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৪/৭৪৪ পৃ:; তাফসীরে রুহুল মাআনী, ১৫/৬৫৩ পৃ ।
হানাফী ইমাম ও অন্যান্য আলিমদের আমলের জবাব:
* লিফলেটে বলা হয়েছে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ. বার তাকবীরের সাথে আমল করেছেন। এর জবাবে আমরা বলবো মাওলানা সাহেব এক্ষেত্রেও সর্ব সাধারণ কে বোকা বানানোর চেষ্টা করেছেন। তার কারণ তিনি এক্ষেত্রে বাদায়িউস সানায়ে, রদ্দুল মুখতার, দুররুল মুখতার ও শামীর হাওয়ালা দিয়েছেন। এখন আমরা মাওলানা সাহেবের কাছে প্রশ্ন করতে চাই, আপনি যেই রদ্দুল মুখতার, দুররুল মুখতার ও শামীর উদ্বৃতি দিয়েছেন সেখানে কি এ কথা উল্লেখ নেই যে, وبه اخذ ائمتنا الثلاثة অর্থাৎ ঈদের নামাযে অতিরিক্ত তাকবীর ৬টি, এটা ইমাম আবু হানিফা, আবু ইউসূফ ও মুহাম্মদ রহ. এর যৌথ মত। এর পরে বলা হয়েছে ففعلا ذلك امتثالا له لا مذهباً অর্থাৎ ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর ১২ তাকবীরের উপর আমল মাযহাব হিসেবে নয়, কেবল নির্দেশ পালনার্থে। এর পর বলা হয়েছে وعن أبي يوسف أنه رجع إلي ذلك অর্থাৎ ইমাম আবু ইউসূফ উক্ত আমল থেকে ফিরে এসে ৬ তাকবীরের আমল গ্রহণ করেছেন (রদ্দুল মুখতার, দুররুল মুখতার ও শামী ৩/৫৩-৫৪ পৃ।
* অতএব এক্ষেত্রে ইমাম আবু ইউসূফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর আমল দ্বারা দলীল পেশ করার কোন অবকাশ নেই। কারণ এটা তাদের চিরাচরিত আমল বা মত ছিল না। তারা আজীবন ৬ তাকবীরের সাথেই আমল করেছেন এবং উক্তি পেশ করেছেন।
* হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা ও আত্তালিকুল মুমাজ্জাদ কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী ও আব্দুল হাই লক্ষেèৗভী রহ. ১২ তাকবীরে পক্ষে মত পোষণ করেছেন। এর জবাবে বলতে চাই যে ক্ষেত্রে লাখো হানাফী আলেম ৬ তাকবীরের সাথে রায় ব্যক্ত করেছেন, সেক্ষেত্রে দু’এক জন হানাফী আলিম ১২ তাকবীরের সাথে রায় পেশ করলেই কি লাখো হানাফী ওলামা কেরামের রায় কে পরিত্যাগ করতে হবে? দু’এক মাসআলায় এরকম দু’এক জনের মতবিরোধ থাকতেই পারে। আসল কথা হলো সহীহ দলীল প্রমাণে যেটাই প্রমাণিত হবে সেটাই সকলে গ্রহণ করতে বাধ্য। ৬ তাকবীরের হাদীস যেহেতু অধিকতর সহীহ প্রমাণিত হল তাই সকল হানাফী ওলামা কেরাম সেটা গ্রহণ করেছেন।
* ইমাম নববী ও আল্লামা ইবনে আব্দুল বার রহ. এর উক্তি দ্বারা দলীল পেশ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বলবো তারা যখন ভিন্ন মাযহাব অবলম্বী তাই তারা ১২ তাকবীরের পক্ষে উক্তি ব্যক্ত করতেই পারেন কারণ তাদের মাযহাবে এই আমল চালু আছে। অতএব তাদের উক্তি ৬ তাকবীরের বিরুদ্ধে দলীল হওয়ার কোন যৌক্তিকতা নেই।

সার কথা: সুদীর্ঘ আলোচনার দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ৬ তাকবীরের সাথে ঈদের নামায আদায় করা সম্পূর্ণ হাদীস মোতাবেক ও সহীহ। এটাকে হাদীস পরিপন্থী বা বিদআত বলার কোন অবকাশ নেই।
আল্লাহ সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন॥

 Source: http://jamiatulasad.com